মহামারী - আগুন - ছোটগল্প

মহামারী

রাজকুমার মাহাতো



"মহামারী করোনা" কেবল মানুষের জীবন নয়, মানুষের মনুষত্ব, বিবেকেও মেরে দিয়েছে। এই গল্প সেই বিবেক মরে যাওয়ার গল্প।

 

চলতে চলতে প্রায় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল বলাই।
"
আর পারছি লা গো।"
"
ঠিক আছে চলো কেনে ওই গাছতলা খানটায় বসি খানিক!"রিনা বলল।।
লাট্টু বলল : বাবা থাক আমি আর তুমার কাঁধে যাব নি। এবার হাঁটব।
"
থাক থাক,এত রোদে তুকে আর পাকামো মারতি হবেক লাই! চল গিয়ে একটু গাছতলা খানটায় বসি" ধমকের সুরে বলল বলাই।
তিনজনে এসে একটা বড় বট গাছের তলায় এসে বসল।
জলের বোতলটা খুলে ঢক ঢক করে বেশ অনেকটা জল খেয়ে নিল বলাই।


বলাই আর রিনা বাঁকুড়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকে।খড়ের চালে মাটির দেওয়ালে নিকোনো সংসার তাদের।চার বছরের ছেলে লাট্টু। জীবনের থেকেও প্রিয় তাদের।কত ঠাকুর বাড়ি গিয়ে মানত করে তবে এই ছেলে।বাবা পঞ্চাননের আশীর্বাদের ফল তাদের।
যখন লাট্টু হয় সারা গ্রামের লোক তাকে দেখতে এসেছিল।একদম লাল বদনখানা চকচক করছিল তার।মাথা ভর্তি কালো চুল।
গাঁয়ের মোড়ল বলল - ওহে বলাই, যে সাক্ষাৎ বাবা এয়েচে রে তুর দোরে। দেখিস সব কষ্ট ঘুচবে ইবার   তুদের।
আনন্দে গর্বে বলাইয়ের বুকটা ভরে গেছিল।
দিন গড়াতে লাগলো লাট্টুও বড় হতে লাগল
আদরে যতনে একেবারে লালটুস তৈরি হল।

কিন্তু বিপদ ঘটল এই বছর। বৃষ্টি হল না একদম।খরার পরিস্থিতি তৈরি হল।
চাষ করা গেল না। চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল বলাইয়ের গ্রামের প্রায় ষোলটা পরিবার। কিছুদিন জমা আনাজ দিয়ে সংসার চললেও টান পড়ল হাড়িতে। অগত্যা সব পুরুষ যে যেদিকে পারে কাজ নিয়ে চলে যেতে থাকল। একদিন বলাই খবর আনল বাড়িতে। কলকাতায়   রাজমিস্ত্রি এর জোগাড়ের কাজের।
কিন্তু বলাই ছাড়া রিনা আর লাট্টুর কেউ নেই আর ওরা ছাড়া বলাইয়ের কেউ নেই।তাই তারা তিনজন মিলে কলকাতায় চলে এল।

প্রথমবার কলকাতায় এসে লাট্টুর তো মাখোমাখো অবস্থা।বড় বড় বিল্ডিং বড় বড় গাড়ি আগে কখনো দেখেনি সে। বলাই আসত আগে কলকাতা চাষের বীজ কিনতে।রিনাও প্রথম বার কলকাতা এল।

প্রায় একমাস কাজ করল তারা। ঠিকাদার তিনজনকে থাকার জন্য নির্মিয়মান বিল্ডিং এর নীচে একটা জায়গা দিল তাদের।তিন জন একেবারে সংসার গড়ে ফেলল।বলাই আর রিনা সারাদিন কাজ করত। লাট্টু আরো বাচ্চাদের সাথে খেলত।ভালোই চলছিল দিনগুলো।

কিন্তু হঠাৎ এল মহামারী।সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত এই রোগে।
লকডাউন হল ভারত।
যে যেখানে ছিল সেখানেই আটকে থেকে গেল।বাস ট্রেন সব বন্ধ।

গত চার সপ্তাহের বাঁচানো টাকি দিয়ে আরও একসপ্তাহ চলল বলাইয়ের সংসার। কিন্তু তারপর?
টাকা ফুরোতে আরম্ভ করল।
বলাই বাড়ি ফিরতে চাইলো। কিন্তু বাস ট্রেন নেই।আর উপায় না পেয়ে পুঁটলি বেঁধে ছেলেকে কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে তিনজন।
২১২ কিমি পথ। চলতে শুরু করেছে তারা।।
এদিকে কলকাতায় বাড়ছে আক্রান্তদের সংখ্যা।


গাছের তলায় বিশ্রামের পর আবার চলতে শুরু করে তিনজন। প্রায় সারাদিন চলার পর রাতের দিকে তারা পৌঁছায় খাতুল। ছোট্ট একটি গ্রাম।
কিন্তু গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হয় না তাদের।পাছে কলকাতা থেকে তারা নিজেদের শরীরে যদি ভাইরাস বহন করে আনে।
উপায় না পেয়ে গ্রামের বাইরে একটা গাছের তলায় রাত কাটায় তারা।
সকাল হতেই আবার বেড়িয়ে পড়ে তিনজন।
কাঁধে লাট্টু ক্লান্ত।
সারারাত মশার কামড়ে ঘুম হয় নি তাদের। বলাই এর পা চলতে চায় না আর। কিছুটা যাওয়ার পর আবার থেমে যায় বলাই।
ছোট্ট লাট্টু বুঝতে পারে।
"
বাবা চল বটে, হাঁটি একটুখান আবার তুমার কাঁধে পরে উঠবক খন।"
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে লাট্টু।
অসহায় হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে সায় দেয় বলাই।
রিনার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
চলতে শুরু করে তারা।যা খাবার এনেছিল তারা হয়ে যায় তিনজনের দুদিন।

দু দিন পর গভীর রাতে তারা পৌঁছায় নিজেদের গ্রামে।
ফেলে যাওয়া ঘরটা একেবারে বিধস্ত অবস্থায়। তবুও নিজের ভিটে।ঘরে ঢোকে তিনজন। ততক্ষণে লাট্টু বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।তাকে শুইয়ে দেয় বলাই।
রিনা বসে পড়ে নিচে। বলাই পাশে বসে রিনার হাতটা ধরে।
"
দেখ, নিজের ঘর এসে গিচি।আর চিন্তা নেইকো।যা নুন ভাত জুটবেক খেয়ে লিব কিন্তু আর ওই শহরকে যাবক লাই।"
রিনা মাথাটা রাখে বলাইয়ের বুকে।


পরদিন সকালে তাদের ঘুম ভাঙে।ভেতর থেকেই শুনতে পায় "বেড়িয়ে আয় বলাই।রোগ নিয়ে এইচিস কলকাতা দে।"
বাইরে বের হয় বলাই
বাইরে প্রায় জনা দশেক লোক। তাদের মধ্যে পাশের বাড়ির রমা বৌও রয়েছে।
রিনা আর লাট্টু বেড়িয়ে আসে।রমা বৌ এর খুব কাছের লাট্টু।তাকে দেখেই ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চায় লাট্টু।
কিন্তু হায়।রমা বৌ গর্জে ওঠে "ছুবিনে আমায় লাট্টু বলে দিলুম। একদম ছুবিনে
দূরে থাক।"
অবাক হয়ে যায় লাট্টু।চারবছরের শিশুটা ভাবতেও পারে না কি হচ্ছে তাদের সাথে।যে মানুষগুলোর কোলে পিঠে করে সে মানুষ আজ তারাই তাকে ছুঁতে পর্যন্ত চাইছে না।কি এমন করেছে সে। কিছু বুঝতে পারে না লাট্টু।

"
বলাই গ্রামে তুকে ছাড়া আরো অনেক পরিবার আছেক। তুই গ্রাম থিকে চলে যা।আমরা তুর জন্য ওই রোগে মরতি দেখতে পারবক লাই আমার ছিলেপুলেকে।চলে যা তুরা"
বলাইয়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু রমেশ বলল।
"
তুই বুলছিস রমেশ?আরে আমরা একসাথি কত কি করিচি বলদিকি।আজ তুই আমাকে গ্রাম ছাড়তি বলছিস। কোথায় যাবক বুল আমরা।এই ভিটেখান ছাড়া আর কি আছেক বল দিকি আমাদের" একগুচ্ছ কষ্ট বুকে নিয়ে বলল বলাই।
সবাই চিৎকার করে বলতে লাগল : গ্রাম ছাড়তি হবেক বলাইকে।নইলে সবাই এই মহামারীতে মরবেক।।

বলাই আর সহ্য করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলো - গ্রাম ছাড়তি পারবক লাই। মরতে হলি এই ভিটেতি মরব! আর কোথায় যিব আমরা!"
ঘরে ঢুকে দরজা দিল তিনজন।

গ্রামে সভা বসল।মোড়ল বলল এসব মানা যাবেনা।
গ্রাম ছাড়তেই হবে। কিন্তু বলাই নাছোড়বান্দা। গ্রাম ছেড়ে ভিটে ছেড়ে তিনটে প্রাণ যাবেই বা কোথায়। তাদের যে আর কেউ নেই।

উপায় ভেবে পায় না বলাই।যে বাঁচার আশা নিয়ে কলকাতা থেকে নিজেদের গ্রামে নিজেদের লোকের কাছে ফিরেছিল তারা।আজ সেই নিজেদের লোক গুলোই তাদের নিজেদের শত্রু।যে বন্ধুর সঙ্গে সব সংক্রান্তি কাটিয়েছে সে আজ সেও তার শত্রু।যে রমা বৌ লাট্টু কে চোখে হারাত আজ সে তাকে ছুঁতে পর্যন্ত চায় না।
রাগে ঘৃনায় বুক ফেটে যায় বলাইয়ের।এ কেমন রোগ যে চেনা মানুষগুলোকে অচেনা করে দিল।
ভাবতে থাকে বলাই। উপরের টিম টিম করা লন্ঠনটা দুলছে তখন। রিনার মাথা বলাইয়ের বুকে। চোখ দিয়ে জল পড়ছে অনবরত।চেনা মানুষগুলোকে অচেনা হতে দেখে সেও হতবাক।পাশেই শুয়ে লাট্টু। গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখছে সে বাবার সাথে মাঠে ধান রুইছে সে। প্রাথমিক স্কুলের টালির ছাদ দিয়ে চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জল তার বইয়ের পাতায় পড়ল।।।।

বলাই রিনার চোখও লেগে গেছিল। হঠাৎ একটা জ্বলন্ত আগুনের পিনডো এসে পড়ল তাদের খড়ের ছাউনির উপর।দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো তাদের ঘর। আগুনের লেলিহান শিখা একে একে গ্রাস করল তিনটে অসহায় প্রানির শরীর।পোড়া ঝলসানো দেহগুলো থেকে শুধুই চিৎকার ভেসে এল।এ চিৎকার বাঁচার ছিলনা।ছিল একরাশ অভিমানের একরাশ ঘৃনার।ছাই হয়ে গেল তিনটে দেহ একটা সংসার। বাঁচার আশায় যারা কলকাতা থেকে গ্রামে পায়ে হেঁটে ফিরে এল।তারা নিজের গ্রামেই আজ দাহ হল।

একটু দুরে সমস্ত দৃশ্যটা দাড়িয়ে দেখল রমেশ।তারও হাতটা খানিকটা ঝলসে গেছে।
ওই কথায় আছে - পরের ঘরে আগুন লাগাতে গেলে নিজের হাতটাও মাঝে মাঝে পুড়ে যায়।

 সমাপ্ত