এপার-ওপার - মিনি ধারাবাহিক - পর্ব ২

 এপার-ওপার

রাজকুমার মাহাতো

Chatrak-rajkumar-mahato-blog-Bengali-blog-bengali-Stories-এপার-ওপার-ছত্রাক-ব্লগ-রাজকুমার-মাহাতো

পর্ব ২

লাঠিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল নাসিম বাবু। এক-পা দু-পা করে রীতাকে পিছনে ফেলে বাইরের দিকে এগিয়ে গেল। রীতা তাকিয়ে দেখল এক পায়ে খোড়ানো মানুষটা কত সহজেই শুধুমাত্র একটা পেয়ারা কাঠের লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে চলে গেল তাকে পিছনে ফেলে। মনে মনে ভাবল একসময় প্রচুর শক্তিশালী ছিলেন ও কর্মঠও হবেন। সদ্য কিনে দেওয়া নতুন লুঙ্গি আর পাঞ্জাবিটা না পড়ে যে বগল ছেঁড়া জামা আর লুঙ্গিটা পড়ে এসেছিলেন এখানে সেটা পরেই রয়েছেন। বৃদ্ধাশ্রমের নিজস্ব লাঠীটাও না নিয়ে সেই পুরানো পেয়ারা ডালটা নিয়ে ঘুরছেন। এত আত্মসম্মান যদি তা মা’কে ছেড়ে পালিয়ে গেছিলেন কেন? প্রশ্নটা চেঁচিয়ে করতে গিয়েও থেমে গেল রীতা।

অফিস ঘরে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন তুলসী দেবী।ধীর পায়ে এসে সেখানে ঢুকলেন নাসিম বাবু। তুলসী দেবীর সামনের চেয়ারে বসে পড়লেন থপ করে। পেয়ারা ডালটা হাত থেকে নীচে পড়ে গেল। সেটাকে তোলার কোনরকম চেষ্টাও তার মধ্যে না দেখে বিরক্তির সাথে তুলসী দেবী বললেন “ আবার এখানে কেন? খাওয়া তো হয়ে গেল। এবার কি আমার মাথাটা খাবে……?”

এপার-ওপারঃ প্রথম পর্ব পড়ুন

মুচকি হেসে নাসিম বাবু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন “ নতুন সংসার, নতুন মানুষ পুরানো সব কিছু ভুলিয়ে দিয়েছে নাকি?”

নাসিম বাবুর দিকে তাকিয়ে তুলসি দেবী বলল “ মনে রাখার কোন কারণ খুঁজে পাইনি আমি। পুরানো সব কিছুই আমাকে কেবল কষ্ট দিয়েছে। তাই কষ্টগুলোকে আর মনে রাখিনি আমি। আর এই বয়সে এসে আর ওসব মনেও করতে চাইনা।“

তুলসী দেবীর তাকানোয় বুকের ভেতরটা একবার ছ্যাত করে উঠেছিল নাসিম বাবুর। যে চোখটাকে দেখে একদিন তার শরীর গরম হত আজ সেই চোখদুটোই তাকে কোন একটা প্রাচীন অপরাধ বোধের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।বয়সের সাথে সাথে যে অভিমান রাগ ক্ষোগ গুলো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা সেগুলো আজ আবার তার যৌবন ফিরে পাচ্ছে তুলসী দেবীর চোখে। ঝোলা চামড়ার বুজে আসা চোখগুলো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল তার। আর সেই চোখ থেকে বেড়িয়ে আসা লেলিহান অভিমানের ক্ষোভের শিখা নাসিম বাবুকে মাথা নীচু করতে বাধ্য করল।

মুখটা ওপর দিকে তুলে স্মৃতির অমলিন সাগরে ডুব দিল দুজন। না চাইতেও সেই দিনটা তাদের সামনে ছায়াছবির আকারে ভেসে উঠতে লাগলো।

প্রেমের উপন্যাসিকা পড়ুন

দিনটা ভারত আর পাকিস্তানের বিভক্ত হওয়ার দিন। এক দেশের মানুষ তখন দুটি ভাগে বিভক্ত। হাতে হাত রেখে স্বাধীনতার লড়াই করা মানুষ গুলো তখন একে অপরকে নিজেদের ভাগ থেকে তাড়াতে মরিয়া। তখন নাসিমের বয়স হবে সতেরো। মাত্র মাস কয়েক আগেই পনের বছরের সাহিদাকে নিকাহ করে ঘরে এনেছে সে। সাহিদার কাজল-কালো চোখ নাসিমকে সব ভুলিয়ে একটা গোটা সংসারের দিকে টেনে আনছে। তবে নাসিম চিরকাল শক্ত। ভিতর থেকে মুচড়ে গেলেও কেউ ভনক টুকুও পাবেনা।

সে দিন সবে একগাল ভাত থালায় নিয়ে বসেছে নাসিম। পাশে বুড়ি মা একটা হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করছে আর দরজার এক কোনে দাঁড়িয়ে সাহিদা। এদিকে দেশ ভাগের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তাই সাহিদার মন খারাপ। যে দেশে জন্মাল বড় হল নতুন সংসার পেল সেই দেশ ছেড়ে আবার নতুন দেশে গিয়ে নতুন করে সংসার বাঁধতে হবে। এ কেমন স্বাধীনতা। কেন একটা গোটা দেশ এপার-ওপারে ভাগ হয়ে গেল। এসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল তার। চকচকে দু-গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল মেয়েটার।

খেতে খেতে নাসিম সাহিদার দিকে তাকিয়ে বেশ রাগের সাথেই বলে “ মরা কান্না কাঁদিস নি তো আর। এ দেশ আমারও।ভিটে মাটি ছেড়ে এত সহজে চলে যাব আমি? আরে আমরা ভাই-ভাই কারোর উস্কানিতে কিচ্ছু হবেনা। মরা কান্না টাকে বন্ধ কর এবার। এপার-ওপার যারা করেছে তারা বুঝবে। এ দেশের দু-ভাগ সম্ভব নয়। তা না হলে…………”

“নাসিম ভাই পালাও।পালাও। ওরা আসছে।“ পাশের বন্ধু আসলামের চেঁচানোয় চমকে উঠল নাসিম। মুখ ঘুরিয়ে দেখল আসলাম ছুটে ছুটে তাদের দিকে আসছে। ভাত মাখা হাতটা একটু ঝেড়েই উঠে দাঁড়িয়ে নাসিম আসলামকে বলল “ কি বলছিস ভাই?কোথায় পালাব? কেন পালাব?”

ছোটগল্প - মা টুনটুনি পড়ুন

আসলাম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল “ জানিনা, তবে এ দেশ আমাদের ছাড়তি হবে। এ দেশে আর আমাদের জায়গা নি গো ভাই। চলো তাড়াতাড়ি ওই দেখ সাঁকো পেইড়ে আসছে তারা। আমাদের সমেত ঘর জ্বালাবে বলে।আমাদের ওপারে যেতি হবে, এপার তাদের। আর ওপার থেকেও আমাদের মতই ওদেরও তাড়া খেতে হচ্ছে। এ কি হল ভাইজান।“

এক মূহুর্তে নাসিমের সব বিশ্বাস ভেঙ্গে চুর-চুর হয়ে গেল। বুড়ি মা জোড়ে জোরে কান্না জুড়ে দিল আর সাহিদা চৌকাঠে থপ করে বসে পড়ল।

এক কাপড়ে মা আর বউকে নিয়ে বেড়িয়ে গেল নাসিম। সাথে শয়ে শয়ে সেপারের মানুষ। হ্যাঁ, এ দেশ তখন নাকি আর তাদের ছিলনা। যদিও সে দেশেরও একই হাল ছিল সে-সময়। সে দেশও ওপার থেকে এপারের মানুষ উচ্ছেদে ব্যস্ত। কেবল ভাগিয়ে বিদায় করার পালা চলছিল তখন এপার আর ওপার মিলিয়ে।কিছু মানুষের উস্কানি তখন একটা গোটা দেশের সাথে মানুষকেও ভাগ করেছিল।

রাত তখন কতটা গভীর হবে জানেনা নাসিম। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছে সে তার মা আর বঊকে নিয়ে। যে যেদিকে পেরেছে ছিটকে গেছে। সবার তখন একটাই লক্ষ্য নদীটা পেরিয়ে ওপারের মাটিতে পা রাখতেই হবে নয়ত সকাল হলেই মৃত্যু।

পাশের জনকে দেখা যাচ্ছে না অন্ধকারে। তার উপর মশার অবিরাম কামড়। এদিকে গুলি খাওয়ার অথবা গলা কাটার ভয়। মাঝে মাঝেই নাসিম ধীরে ধীরে বলছে “ সাহিদা হাত ছাড়বি না, তাহলেই হারিয়ে যাবি। আর পাবনা। “ সাহিদার পায়ের তলায় কেটেকুটে তখন রক্তের দাগ এপারের ওই রাস্তার প্রতিটা ঘাসে নিজের চিহ্ন রেখে যাচ্ছে।

হঠাত একটা বিকট শব্দ। দূরে গুলি চালিয়েছে কেউ। নাসিম সাহিদাদের নিয়ে নীচে বসে পড়ল। একটা প্রকান্ড বটগাছ। তার নীচে হোগলা বনের মধ্যে বসেছে তারা। সাহিদার মুখ থেকে কোন কথা বেরোচ্ছে না। বুড়ি কেবল ওপর-ওয়ালা কে ডাকছে। নাসিমের চোখ সামনের দিকে।

কিছুক্ষন চারিদিকে নিস্তব্ধতা। আবার একটা জোড়ে আওয়াজ। চেঁচিয়ে উঠল নাসিম “ আবার গুলি চলল। সাহিদা আম্মি পালাতে হবে। এক নিঃশ্বাসে দৌড় লাগাও। সাহিদা দৌড়া তুই। আমি আম্মিকে কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছি।“শুরু হল দৌড়।

এক নিঃশ্বাসে দৌড়াতে দৌড়াতে কতদূর এল সাহিদা জানেনা। সে পথের আর শেষ আছে কিনা তাও জানেনা সে। হাপিয়ে মাটিতে পড়ে গেল সাহিদা। চোখটা মেলে দেখল চারিদিকে কেবল অন্ধকার। নাসিমের আর কোন সাড়া-শব্দ পেলনা সাহিদা। অস্ফুট স্বরে একবার ডেকে উঠল “নাসিম। আমাকে একা ফেলে যেওনা। যেওনা আমাকে ফেলে।“ আর কিছু মনে নেই সাহিদার।


পরবর্তী পর্ব পড়ুন