এপার-ওপার - মিনি ধারাবাহিক - পর্ব ১

 এপার - ওপার

রাজকুমার মাহাতো

এপার-ওপার-ছোটগল্প-রাজকুমার-মাহাতো-বাংলা-ব্লগ-দেশ-ভাগের-গল্প-নারীবাদী-গল্প

পর্ব ঃ ১


বলাই নাসিম বাবুকে চিকেন স্ট্রুটা দিয়েছিলে?” রীতা ফোনে বলল বলাইকে।

বলাইও ফোনের এপার থেকে উত্তর দিল “হ্যাঁ দিদি, অনেক আগেই দিয়েছি। তবে এখনও অর্ধেকটা পড়ে আছে। মা না এলে খাবেন না উনি। জেদ ধরে বসে আছেন।“

ফোনটা কেটে দিল রীতা। সদ্য অষ্টআশি পেরোনো তুলসী দেবীর দিকে তাকিয়ে বলল “ যাবে মা একবার? না খেলে ওনার শরীর খারাপ হয়ে যাবে। একবার চলোনা মা।“

তুলসী দেবী গোবিন্দ তুলসীর চারাটাকে টবে পুঁতে সবে একটু জল দিচ্ছিলেন।এই বয়সেও ডাঁটো মহিলা হিসেবে পরিচিত তিনি এলাকায়। আর পুরো দেশে তার নাম একডাকে সবাই চেনে। তার “শান্তিনীড়” বৃদ্ধাশ্রমের জন্য সদ্য অনেকগুলো দেশীয় পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।রীতার বয়সও পঞ্চান্ন এর কোটায়। স্বামী মরেছে দু-বছর হলো। ছেলেদুটো বিদেশে থাকে। তাই রীতা মায়ের কাছে থেকে তার দেখাশোনা করেন।

শুকিয়ে যাওয়া চামড়ার হাতটা তখনও ভিজে কাদায় ভর্তি। হাতটা বেসিনে ধুয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললেন “দেখ রীতা গোবিন্দ তুলসী। একবার গাছটাকে ছুঁয়ে হাতটাকে নাকের কাছে ধরে দেখ। গন্ধে মন ভরে যাবে। আর একটু বড় হলে সারা বাড়িটাকে নিজের সুগন্ধে ভরিয়ে দেবে এই তুলসী।“

রীতা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল “ কথা ঘুরিয়ো না মা ।কতদিন এভাবে পালিয়ে বেড়াবে? নিয়তি ওনাকে তোমার সামনে আবার এনে দাঁড় করিয়েছে।নিয়তির থেকে কেউ পালাতে পারেনা মা। তুমিই তো বলো। একবার চলোনা। “

তুলসী দেবী রীতার দিকে তাকিয়ে বলল “ নিয়তির হাতে আমাকে ফেলে সেদিন ও পালিয়ে গেছিল। আর আজ সেই নিয়তি আবার ওকে আমার সামনে নিয়ে এসেছে বুঝেছি। কিন্তু আমি কি করব? ও সেদিন যেটা আমার সাথে করেছিল নাকি তোর বাবা সেদিন যেটা আমার সাথে করেছিল? কোনটা সেটাই তো ভেবে পাচ্ছিনা মা।“

রীতা মায়ের আরও একটু কাছে এসে বলল “ হয়ত ওনার কাছে কোন উপায় ছিলনা মা।“

তুলসী দেবী মুচকি হেসে বলল “ উপায় থাকেনা মা, তৈরি করে নিতে হয়। যেমন তোর বাবা সেদিন করেছিল।“

রীতা মায়ের হাতটা ধরে বলল “ তুমি কি চাইবে কেবলমাত্র তোমাকে না দেখতে পাওয়ার জন্য একটা লোক এভাবে না খেয়ে মারা যাক?”

তুলসী দেবী আর কোন কথা না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রীতা বুঝল ঠিক জায়গায় টোকাটা মেরেছে সে। এবার একটা পজিটিভ রিপ্লাই আসবেই।

দরজা খুলে শাড়ীর আচলটা কাঁধে নিয়ে তুলসী দেবী বলল “ চল, কোথায় যেতে হবে।“

রীতা প্রস্তুত ছিল আগে থেকেই তাই মাকে নিয়ে বেড়িয়ে গেল সে। একটা গভীর অভিমানে দগ্ধ মন নিয়ে তুলসি দেবী এগিয়ে চলল সেই অভিমানের স্তুপ টার দিকে।

মুখ ঘুড়িয়ে বসে নাসিম বাবু। বছর নব্বইয়ের কোটায় বয়স।পাশে একটা প্লাস্টিকের ঝুড়ি দিয়ে ঢাকা আধ-খাওয়া চিকেন স্ট্রু এর বাটি। অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে বসে আছেন তিনি আর মনে মনে ভাবছেন সেই সময় তার কি করার ছিল। সে যেটা করেছিল অন্য কেউ হলে তাই হয়ত করত। নাকি সে ভুল করেছিল? কিন্তু যদিও ভুল করেই থাকে তাও একসময়ের সম্পর্কের টানে কি একবার আসতে পারেনা সাহিদা? কেন? তার কি এমন ভুল? সে তো চেষ্টা করেছিল সাহিদাকে নিজের সাথে নিয়ে যাওয়ার কিন্তু……………

“ খাননি কেন খাবারটা?” রীতার কথায় ঘোর কেটে গেল নাসিম বাবুর।মুখটা সামনের দিকে করতেই দেখল তার সামনে রীতা দাঁড়িয়ে আর তার পিছনে কালো রঙের বোরখা পড়ে বছর পনেরোর সাহিদা। বোরখার ভেদ করে হালকা তার চোখগুলো দেখা যাচ্ছিল। বিনা কাজলেও সাহিদার চোখগুলো একেবারে কাজল কালো। একবার সেই চোখ যে দেখবে তার আর ভোলার অবকাশ নেই।

“কি হল, উত্তর দিচ্ছেন না যে?” রীতার দ্বিতীয় প্রশ্নে আবার একটা ঘোর কাটল নাসিম বাবুর। এবার সে দেখল সেই পনেরো বছরের মেয়েটার চামড়া গুলো সব ঝুলে গেছে। মাথার চুলগুলো সব এক্কেবারে সাদা। পড়নে একটা সাদা থানের শাড়ী। গলায় একটা মোটা মতন রুপোর চেন। চোখগুলো তার আজও একি রকম কাজল-কালো। ওই যে, যে একবার দেখবে ভুলতে পারবে না। তাই হয়ত নাসিম বাবুও ভুলতে পারেনি।

ক্ষয়ে যাওয়া গলার স্বরে নাসিম বাবু বললেন “ও আসছিল না কেন? তাই আমি খাইনি।আর কাল থেকে না এলে খাবও না। এই বলে দিলুম।“

বেশ গম্ভীর একটা স্বরে রীতা বলল “ কেন? উনি কি আপনার পার্সোনাল প্রপার্টি নাকি? যে আপনি ডাকলেই ওনাকে আসতে হবে।“

নাসিম বাবুও বেশ গর্ব দেখিয়েই বললেন “ হ্যাঁ, তা বটে। আমার বিবি ও। আমার কথা মানবে না আবার? তাই দেখো কিরকম ছুটে এসেছে।“ বলেই একটাও দাঁত না থাকা মুখটা দিয়েই একটা হাসি হাসলেন এবং পাশে থাকা বাটিটা তুলে খেতে শুরু করলেন।

দুপুরের মাথার উপর থাকা সুর্যের মত চোখে আটকাচ্ছিল নাসিম বাবু তুলসী দেবীর।তাই ওনার দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন তুলসী দেবী। তবে তার তাপে নিজেকে বদ্ধ পাচ্ছিলেন তিনি। রীতার দিকে তাকিয়ে তুলসী দেবী বললেন “ দেখলি তো কেন আসছিলাম না? ও সারাটা জীবন একই থেকে গেল।ওর কথাবার্তা আজও সেই জানোয়ারদের মতই আছে।“

খাওয়াটা শেষ করে নাসিম বাবু আড় চোখে একবার তুলসী দেবীর দিকে তাকিয়ে বলল “ হ্যাঁ। আমাকে তো জানোয়ার মনে হবেই। অন্য মানুষ খুঁজে পেয়েছিলে কিনা।“

কিছু না বলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল তুলসী দেবী। রীতা বলাইকে ডেকে বলল “ বলাই কাল থেকে যদি ঊনি না খেতে চায়, ওনাকে খেতে হবেনা। আমাদেরকে ফোন করার কোন দরকার নেই। এইসব লোকের থেকে আমার মা’কে আমি দূরেই রাখতে চাই।“

কর্কট একটা দৃষ্টি রীতার উপরেও এসে পড়ল নাসিম বাবুর চোখ থেকে। উপরের সাদা হয়ে যাওয়া ভ্রু গুলো কুঁকড়ে একপাশ ওপরে আর একপাশ নিচের দিকে নেমে গেল। তার চোখে-মুখে একটা অচেনা গর্ব দেখল রীতা। যে গর্বটা সে কোনদিনই তার বাবার মধ্যে দেখেনি।

পরবর্তী পর্ব পড়ুন

চলবে