কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী - রোবোটি - প্রথম পর্ব

RoBoTi

রাজকুমার মাহাতো

পর্ব ১

 আমরা আর ক’জন আছি?” নার্গিস প্রশ্নটা করল শিবকে।

শিব একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল “ আমাকে আর তোমাকে নিয়ে ছয় জন।“

নার্গিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “ আমাদের সময়ও ঘনিয়ে আসছে।

বেশিদিন আমরা আর এখানে অভিযোজন করতে পারব না।“

শিব নার্গিসের দিকে তাকিয়ে বলল “ আমার জীবন তো প্রায় শেষ। আমি গেলেও কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তুমি, ডিসুজা, রবিন, শিবানী, আলেয়া এদের তো সবে শুরু তোমাদের বাঁচতেই হবে। ফিরতেই হবে এখান থেকে নিজেদের মধ্যে।“

আলেয়া শিবানীকে বলল “ দিদি আমি কোনদিন ফিরতে পারব পৃথিবীতে?”

শিবানী দশ বছরের আলেয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল “ আমরা ফিরব সোনা। আবার ফিরব আমাদের সেই চেনা শহরে। যেখানে ভোরের বেলায় সূর্য দেখব রাতের বেলা চাঁদ তারাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াব। আমরা ফিরব তুই দেখিস। আমরা ফিরবই।“

নার্গিস শিবানীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল “ সত্যিই আমরা ফিরব দেখিস। “

ডিসুজা প্রশ্ন করল “হাউ মেনি ডেস উই আর হিয়ার।“

নার্গিস হো হো করে হেসে উঠল। মিনিট দুই টেনে হাসল নার্গিস। তারপর হাসি থামিয়ে বলল “ এখানে কখন যে দিন হয় আর কখন রাত সেটাই বুঝতে পারছি না। আর দিন কি করে বুঝব! উই আর হিয়ার ফ্রম আ সিভিলাইজেশন। দেখো আলেয়া কত ছোট মতন ছিল যখন আমরা ওকে প্রথম দেখলাম। এখন মেয়েটা কত লম্বা হয়ে গেছে। আমাদের মতন বুঝতে শিখেছে। আসলে যে আমরা বন্দি এই সব কৃত্রিম মানুষদের হাতে সেটা বুঝে গেছে আলেয়া। “

হঠাৎ রবিন দরজার সামনে থেকে তাদের দিকে ছূটে এসে বলল “ হারি আপ, আসছে ওরা।“

সবাই যে যার বেডে চোখ বুজে শুয়ে পড়ল আবার। নার্গিস একবার একচোখ তাকিয়ে খালি বলল “ হ্যাপি শ্লিপ গাইস।“

ঘুমানোর চেষ্টা তাদের করতে হয়না। বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুমিয়ে পরে তারা। রোবোটির এটাই নিয়ম। ঘুমাতে ঘুমাতে জীবন শেষ হয় একটু একটু করে।

 

সালটা ২০২০। পুরো পৃথিবী মহামারীর কবলে। চারিদিকে মৃত্যু, হাহাকার। তার মধ্যেও মানুষের বাঁচার চেষ্টা আগামী দিনের জন্য।

নার্গিস আর শিব একটি গবেষনা কেন্দ্রে কর্মরত। এখানে এসেই পরিচয় দুজনের দুজনের সাথে। শিব নার্গিসের থেকে প্রায় বছর পনেরো এর বড়। নার্গিস সবেমাত্র তার উনত্রিশ তম জন্মদিন পালন করে “রোবোটি”তে জয়েন করেছে।

রোবোটি একটি এমন গবেষনা কেন্দ্র। যেখানে মানুষের থেকে রোবোট দের দিয়ে বেশি কাজ করানো হয়। এখানে উৎপন্ন করা হয় নানা ধরনের উন্নত মানের রোবোট।যাদের দেখতে একেবারেই মানুষের মত কিন্তু তারা কোনমতেই মানুষ নয়। একটি রিমোট দ্বারা পরিচালিত যন্ত্র মাত্র। যাদের প্রায় প্রত্যেকের প্রান এখানকার হেড “অগাস্টিন” সাহেবের হাতে। তিনিই পরিচালনা করেন এই সব যান্ত্রিক মানুষদের।

অগাস্টিন একজন নামকরা সাইন্টিস। কিছুদিন নানা জায়গায় থেকে কাজ করে শেষে ভারতেই একটা নিজের গবেষনা কেন্দ্র তৈরি করেছে। বলতে গেলে রোবোটি অগাস্টিনের কাছে তার সন্তানের মত। যেমন একটি সন্তানকে তার পিতা মাতা ছোট থেকে বড় করে তোলে ঠিক সেরকমই রোবোটিকেও অগাস্টিন আর সিনেস্কি মিলে ছোট থেকে বড় করেছে।

সিনেস্কি হল অগাস্টিনের মিসেস। যেমন তার রুপ তেমনই গুন। তিনি পারেননা এমন কোন কাজ পৃথিবীতে নেই। অগাস্টিন পুরো রোবোটির নয়শ রোবটের মধ্যে একমাত্র সিনেস্কির উপরই ভরসা করে। আর কারও উপর নয়।

অগাস্টিন আর সিনেস্কির একটাই স্বপ্ন। তাদের তৈরি রোবোট দিয়ে পৃথিবীতে রাজত্ব করা।

এখানে রক্ত মাংষের মানুষ কর্মচারি হিসেবে প্রথম শিব আর নার্গিস। তাই যেদিন তারা প্রথম এল সেদিন সিনেস্কি একটি ওয়েলকাম পার্টির ব্যাবস্থা করেছিল। সবার সামনে তাদের সম্বর্ধনা জানিয়ে তবে রোবোটিতে ঢুকেছিল তারা। যদিও শিব বোম্বে থেকে আর নার্গিস কোলকাতার বাসিন্দা। সেদিনই তাদের প্রথম দেখা।

চুক্তি অনুযায়ী শিব আর নার্গিস আগামী পাঁচ বছর এই রোবোটি থেকে বেরোতে পারবে না। আসলে অগাস্টিন সেরকম দেখেই লোক এনেছিল যাদের কোন পিছুটান নেই। শিবের স্ত্রী মারা গেছিল একমাস আগেই ।স্ত্রী ছাড়া আর কেউ ছিলনা তার আর নার্গিসের মা ছোট বেলাতেই মারা গেছিল বাবাও দু – বছর আগে একটা এক্সিডেন্ট এ মারা গেল। তারপর থেকে নারগিসের জীবনে সে আর তার কাজ ছাড়া কেউ ছিলনা। অনেক খোঁজ করে তবে এখানে এই দুজনকে এনেছিল অগাস্টিন।

কিন্তু তারা যে এভাবে বন্দি হয়ে যাবে বুঝতে পারেনি নার্গিস প্রথমে। শিব নার্গিসকে একদিন বলল “ তোমার কি এখানে কিছু অস্বাভাবিক মনে হয়নি নার্গিস?”

নার্গিস বলল “না তো। কেন আপনার মনে হয়েছে কিছু?”

শিব বলল “ আমার মনে হয় আমরা চারজন মানে আমি, তুমি, স্যার আর ম্যাডাম ছাড়াও এখানে আরও মানুষ আছে।“

নার্গিস চমকে উঠে বলল “ কি বলছেন? কিন্তু অগাস্টিন স্যার তো বললেন আমরা প্রথম মানুষ কর্মচারি এখানে। “

শিব বলল “ না, আমি আজ সকালে দুজনকে দেখলাম। আমার দিকে তাকিয়ে তারা আবার অন্যদিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের তাকানোটা দেখে মনে হল সে তাকানো কোন যান্ত্রিক মানুষের তাকানো হতেই পারেনা।“

নারগিস একটু হেসে বলল “ না শিব । ভুল করছ তুমি। শুধুমাত্র তাকানো দেখে তুমি রোবট আর মানুষের মধ্যেকার তফাৎ বুঝতে পারবে না। আর তাছাড়া এই রোবোট অগাস্টিনের তৈরি মনে রেখো।“

শিব নার্গিসের কথাটা পাত্তা না দিয়েই বলল “ আমি মানতে পারছি না নার্গিস। আমার চোখ এত ধোকা খেতে পারেনা। আমি তোমাকে প্রমান দেব।“

নার্গিস বলল “ তা দিও । এখন কাজে মন দাও। ৩২১ নম্বর রোবোট টার একটা চোখ কাজ করছে না। দেখে নাও।“

শিব আর কিছু না বলে কাজে মন দিল।