কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী - RoBoTi - পর্বঃ ৫

 

RoBoTi

রাজকুমার মাহাতো

কল্পবিজ্ঞানের-কাহিনী-রোবোটি-ছোটগল্প-Bengali-story-blog-বাংলা-ব্লগ-বাংলা-কল্পবিজ্ঞান-উপন্যাস-Bangla-personal-blog

পর্ব ঃ ৫ (অন্তিম)

হঠাৎ প্রায় জনা দশেক রোবোট নিয়ে হাজির হল অগাস্টিন আর সিনেস্কি। শিব নার্গিসেরা চমকে উঠল রোবোটদের দেখে। তারা আলেয়ার কথা অনুযায়ী সব ক’টা রোবোটকে ডি-আক্টিভেট করেছে তাহলে এই রোবোট গুলো কিভাবে এল!

অগাস্টিন হেসে বলল “ কি ভেবেছিলে তোমরা আমার সব রোবোটদের অকেজো করে দেবে! তা আর হলনা। রোবোটিতে এসব করা অত সোজা নয় শিব। অনেক হয়েছে তোমাদের, এবার তোমরা যে যার বেডে ফিরে যাও। এখান থেকে বেরোতে তোমরা পারবেনা।“

শিব হাত জোড় করে বলল “ প্লিস অগাস্টিন আলেয়াকে ছেড়ে দাও, প্লিস। ওকে ওর মা-বাবার কাছে যেতে দাও। দয়া করো ওর উপর।“

সিনেস্কি মুচকি হেসে বলল “ ও ওর মা বাবার কাছেই আছে শিব। চিন্তা করোনা।“

সবাই চমকে উঠল। নার্গিস অবাক হয়ে প্রশ্ন করল “মানে? কে ওর মা বাবা?”

সিনেস্কি বলল “ উই আর আলেয়া’স পেরেন্টস ডিয়ার। আমি আর অগাস্টিন আলেয়ার মা বাবা।“

এক্টুকরো আকশ যেন ভেঙে পড়ল নার্গিস আর শিবের মাথায়।সব যেন এক মূহুর্তে কেমন এলো-মেলো হয়ে গেল।

শিব প্রশ্ন করল “ কি করে? তাহলে ও বন্দি কেন?”

অগাস্টিন বলল “ যেদিন আমি সিনেস্কি কে তৈরি করলাম। সেদিনটা খুব মধুর একটা দিন ছিল বাইরের হাওয়া-বাতাস তখন রোবোটিতে খেলা করত। ধীরে ধীরে সিনেস্কিকে আমি একটা নারীর রুপ দিলাম। একেবারে সম্পুর্ন নারীর।“

আরও পড়ুনঃ এ গল্প অপু না দুর্গার?

নার্গিস প্রশ্ন করল “ মানে সিনেস্কি মানুষ নয়?”

অগাস্টিন রেগে গিয়ে বলল “ আমি কথা বলছি, আমার কথার মাঝখানে কেউ যেন কথা না বলে।“

অগত্যা সবাই চুপ করেই গেল। যদিও নার্গিস আর শিব ছাড়া সবাই চুপ করেই ছিল। আলেয়া নার্গিসের ফ্রক টাইপের জামাটার একটা কোনা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।আর সব কথা শুনছিল।

অগাস্টিন আবার চালু করল “ এমন একজন রোবোট নারী তৈরি করলাম আমি, যার সাথে আমি চাইলে যৌন সংসর্গও করতে পারব। আর একদিন হলও তাই। আর তার ফলাফল রুপে বেরোল 'আলেয়া'।যদিও সিনেস্কির ওভারি একটা ঠান্ডা ঘরেই ধীরে ধীরে পূর্ন হয়েছিল কারন একজন রোবোটের গর্ভ তৈরির ফর্মূলাটা আমি জানতাম না।আজও জানিনা। আমি আর সিনেস্কি একসাথে বসে দেখতাম আলেয়া কিভাবে একটু  একটু করে বেড়ে উঠছে সেই টিউবের মধ্যে। তারপর একদিন আলেয়া সেই টিউব থেকে বেড়িয়ে এল। আমরা আমাদের প্রথম সন্তানকে হাতে পেলাম। কিন্তু আমরা জানতাম আলেয়া মানুষ আর রোবোটের মিশ্রনে তৈরি। তাই ওকে হিউম্যান হরমোন দিতে হবে নয়ত ও ধীরে ধীরে একটা সম্পূর্ন রোবোটে পরিনত হবে।তাই তোমাদের মত মানুষদের এখানে এনে তাদের হরমোন আলেয়ার শরীরে দেওয়ার কাজ শুরু হল আমাদের। আর আলেয়াকে মানুষদের সাথে রাখা হল যাতে সে মানুষের মত আচার ব্যবহার সব শিখতে পারে।“

শিব মুখটা নীচের দিকে করেই প্রশ্ন করল “তাহলে আমাদের পরে নতুন মানুষের ব্যবস্থা করা হলনা কেন?”

অগাস্টিন বলল “ কারন, আর ঠিক পাঁচ মিনিট দুই সেকেন্ড পর আলেয়া সম্পূর্ন মানুষ রুপে পরিচিতি পেয়ে যাবে। ওর শরীরে এক জীবনের মত হিউম্যান হরমোন দেওয়া হয়ে গেছে।“

শিবানী মুখটা তুলে বলল “ তাহলে এবার আমাদের মুক্তি দিন প্লিস। আপনি আপনার কাজে সফল হয়েছেন। আপনার মেয়েও এখন আপনার কাছেই থাকবে। আমাদের এবার মুক্তি দিন প্লিস।“

হো হো করে হেসে উঠল অগাস্টিন। তারপর একটু জিরিয়ে নিয়ে বলল “ পাগল তোমরা? এখান থেকে বেড়িয়ে তোমরা সব পুলিশকে বলে দেবে। তারপর আমার রোবোটিকে ওরা বন্ধ করে আমাকে সিনেস্কি’কে আলাদা করে আমার মেয়েকে কোন একটা মিউজিয়ামে তুলে রাখবে। সে আমি হতে দেবনা। তোমাদের আসলেই মরতে হবে শিবানী। তৈরি হয়ে যাও শিবানী।“

আরও পড়ুনঃ রুপকথার গল্প - বুটুর মা আর চরকা কাটা বুড়ি

শিবানীর সারা শরীর ততক্ষণে কাঁপতে শুরু করেছে। নার্গিস তার হাতের মুঠোটা শক্ত করে দাঁতে-দাঁত পিষে দাঁড়িয়ে আছে। শিবেরও সারা শরীর বেয়ে খেলে যাচ্ছে একটা অজানা মৃত্যু আতঙ্ক।তার চোখের সামনেটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।

আলেয়াকে সিনেস্কি ডেকে বলল “ আলেয়া কাম হেয়ার। এখানে এসো সোনা। এবার আমরা একসাথে থাকব। খুব মজা হবে।“

আলেয়া নার্গিসের ফ্রকের কোনটা ধরেই বলল “ কে তুমি? চিনিনা তোমায়। আমাকে দয়া করে দিদির সাথে যেতে দাও প্লিস।“

অগাস্টিন চেঁচিয়ে বলল “আলেয়া এদিকে এসো।“

আলেয়ার কোন হেলদোল নেই সে নার্গিসের ফ্রকের কোনটা ধরেই দাঁড়িয়ে বলেই যাচ্ছে “ আমি দিদির সাথে যাব। আমাকে ছেড়ে দাও তোমরা।“

নার্গিসের চোখের কোনে জলের বিন্দু গুলো চিক-চিক করছে। এ মানুষ আর কৃত্রিম মানুষের লড়াই আজ। নার্গিস হেসে বলল “ দেখো অগাস্টিন। ও মানুষ রুপে পরিনত না হয়েও কেবল মানুষের সাথেই থাকতে চাইছে। তোমরা ব্যর্থ সিনেস্কি। ওকে তোমরা আর পাবেনা। তোমাদের মত রাক্ষসদের কাছ থেকে ও মুক্তিই চাইবে। কেবল মুক্তি।“

অগাস্টিন হুংকার করে উঠল। “এসব ন্যাকামো কথায় আমি বিশ্বাসী নয় নার্গিস। তোমরা আমার মেয়েকে আমার থেকে কাড়তে পারবে না। “

এদিকে থাকা চারজন একসাথে হেসে উঠল। হা হা হা, হো হো হো…তুমি ব্যর্থ অগাস্টিন তুমি ব্যর্থ।আলেয়া তখনও নারগিসের ফ্রকের কোন ধরে দাঁড়িয়ে।

সিনেস্কি চেঁচিয়ে বলল “৩৩২ ও ৫৬৮ যাও তোমরা গিয়ে আলেয়াকে নিয়ে এস আর এদের বন্দি করে মৃত্যুদন্ড দাও। এক্ষুনি।“

অগাস্টিন সিনেস্কিকে বলল “ আমাদের স্বপ্ন পূরন হতে আর ২ মিনিট। তারপর আমাদের মেয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে আর এইসব মানুষগুলোর আমাদের কোন প্রয়োজন পরবে না।“

সিনেস্কি খুব খুশি হল। কিছু তাদের থেকেও বেশি খুশি হল নার্গিস। কারন, ৩৩২ আর ৫৬৮ তখন তাদের দিকেই যাচ্ছিল। সে আলেয়াকে বলল “ যাও আলেয়া,আমাদের জার্নি এখানেই শেষ। তোমার সাথে আবার আমাদের দেখা হবে চেনা পৃথিবীতে। যেখানে আমরা মুক্ত। যাও আলেয়া যাও।“

আলেয়া কেঁদে উঠল “প্লিস নার্গিস দিদি, আমাকে এভাবে তোমরা নিজেদের থেকে দূরে করে দিওনা প্লিস।“

৩৩২ আর ৫৬৮ এসে আলেয়ার হাত দুটো ধরে নিয়ে গিয়ে অগাস্টিনের হাতে তুলে দিল। আলেয়া কান্না ভরা চোখে অগাস্টিন আর সিনেস্কির সাথে সামনের দিকে এগোতে লাগল।এদিকে ৩৩২ আর ৫৬৮ এসে নার্গিসদের আবার বন্দি করাতে যেই তাদের হাত ধরতে গেল। নার্গিস শিবের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল “রেডি শিব। এক দুই তিন………”

৩৩২ + ৫৬৮ = ৯০০ একসাথে দুটো সিস্টেমে ইনপুট করল শিব আর নার্গিস। ব্যাস, চারিদিকে আবার নিঃস্তব্দতা। থমকে গেল রোবোটি। থমকে গেল সিনেস্কি। হ্যাঁ, সিনেস্কিও ডি-এক্টিভেট হয়ে গেল। কারন আলেয়া বলেছিল টোটাল রোবোটের সংখ্যা যদি দুটো রোবোটকে প্লাস করে প্রেস হয়। রোবোটিতে থাকা সমস্ত রোবোট ডি-আক্টিভেট হয়ে যাবে। নার্গিস জানত এখানে ৮৯৮ টা রোবট আছে, তাই সে আগে ৩৩১+৫৬৭ =৮৯৮ মেরেছিল কিন্তু তাতে তারা রোবটগুলো ডি-আক্টিভেট হয়নি কারন এখনও এখানে আরও দুটি রোবট ছিল । সিনেস্কি আর আলেয়া। আর অগাস্টিন সব বলে দিয়ে নার্গিসের কাজটা আরও সুবিধা করে দিল।

অগাস্টিন চেঁচিয়ে উঠল “এ কি করলে তোমরা? সিনেস্কি…………না এ হতে পারেনা।“

এদিকে আলেয়া তখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে মেঝেতে। অগাস্টিন আলেয়াকে কোলে তুলে বলল “ আমার মেয়ে। প্লিস ডু সাম্থিং। প্লিস। অন্ততঃ আলেয়াকে বাঁচাও প্লিস।“

বাকি চারজন দৌড়ে গেল আলেয়ার কাছে। নার্গিস বলল “ অগাস্টিন আলেয়ার আর কত মিনিট বাকি আছে মানুষ হতে?”

অগাস্টিন বলল “ ৩০ সেকেন্ড।“

শিব বলল “ ৩০ সেকেন্ড পরে যদি আলেয়া না ফেরে আমার হিউম্যান সেল দিয়ে ওকে বাঁচানো যেতে পারে।“ নার্গিসের দিকে তাকিয়ে বলল “ নার্গিস প্লিস যদি আলেয়া না ফেরে ওকে তুমি আমার সেল দিয়ে দেবে। কথা দাও।“

নার্গিস ভিজে চোখে বলল “কিন্তু?”

শিব বলল “কোন কিন্তু না, প্লিস ওকে বাঁচাতেই হবে। তুমি আলেয়াকে কথা দিয়েছ ওর সাথে তোমার চেনা পৃথিবীতে দেখা হবে।“

সব কথা শুনছিল অগাস্টিন। সে আর থাকতে না পেরে বলল “ তোমাদের এত কষ্ট দিলাম আমি। তাও তোমরা আমার মেয়েকে বাঁচানোর জন্য নিজেকে বলিদান দিতে রাজি হয়ে গেলে।“

নার্গিস বলল “ আমরা মানুষ অগাস্টিন। তোমার মত জানোয়ার হতে পারিনি এখনও।“

অগাস্টিন মুচকি হেসে বলল “সন্তানের জন্য কোন মানুষ দেবতা হয় আবার কোন মানুষ অসুর। আমি নাহয় অসুরই হলাম।“

এদিকে ৩০ সেকেন্ড পরেও আলেয়ার জ্ঞান এলনা। শিব নার্গিসকে বলল “হারি আপ নার্গিস। আলেয়াকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেল দিতে হবে। তা না হলে ওকে ফিরিয়ে আনা মুস্কিল হবে। প্লিস চলো ওকে আমার সেল দাও। আমার জীবন আমি ওকে উৎসর্গ করলাম।“

নার্গিস কিছু একটা বলেতে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় অগাস্টিন বলল “ না, আমার মেয়েকে কেউ সেল দেবেনা। ও আমার মেয়ে। নার্গিস, শিব আমার সেল নিয়ে ওকে দাও তোমরা।আর কোন কিন্তু নয়। আমার সন্তানকে দেখো তোমরা।প্লিস। নিজের মত করে মানুষ করো ওকে। কথা দাও।“

নার্গিস আর শিব ভাবল সত্যি হয়ত সন্তানের জন্য অনেক কিছু করা যায়। তারা একসাথে বলল “ গর্বিত অগাস্টিন তোমার জন্য। কথা দিলাম আলেয়ার কোনদিন কোন কষ্ট হবেনা।“

হয়ত ভোরের আলো ফুটেছে সবে। একটা বেডে শুয়ে আছে আলেয়া। তার চোখ বন্ধ। পাশে বসে নার্গিস আর শিব। অন্য একটা বেডে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে অগাস্টিন। না, সেল দিতে গিয়ে সে মারা যায়নি।

আলেয়া কিছুক্ষন পর চোখ খুলল। হাসপাতালের জানালা দিয়ে সূর্যের আলোটা তার মুখে এসে পড়ছিল। সে প্রথম সূর্যের আলো দেখল, অনুভব করল। সত্যি তার নার্গিসের সাথে দেখা হল চেনা পৃথিবীতে ।যেখানে তারা মুক্ত।

অগাস্টিন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে রোবোটিতে আবার ফিরে গেল। তাকে আর দেখা গেল না। নিজের মেয়েকে নার্গিস আর শিবের হাতে দিয়ে সে কৃত্রিম মানুষগুলোর মাঝে হারিয়ে গেল।

শিব নার্গিসকে জিজ্ঞেস করল “এটা কোন সাল জানো?”

নার্গিস বলল “২০২৬…………মহামারী আর নেই পৃথিবীতে।আমরা এখন মুক্ত,রোবোটি থেকেও মহামারী থেকেও।“

একরাশ ঠাণ্ডা বাতাস হাসপাতালের জানালা ভেদ করে ভিতরে ঢুকল। সে এক

মুক্ত বাতাস, মুক্ত একেবারেই মুক্ত।


সমাপ্ত