ছোটগল্প - শপথ

শপথ

রাজকুমার মাহাতো

promice-Bengali-short-story-writers-Bengali-short-Story-books-List-of-Bengali-magazines-বাংলা-ছোটগল্প-বাংলা-ম্যাগাজিন-লিটিল

"আজকেও ভালোভাবে শুনছো না তুমি, কত মন দিয়ে গাইছি!" বলে ঋতু আর একবার গাইতে শুরু করল। 

"আমার ভীতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে

তুমি আছো হৃদয় জুড়ে।"

রজত হুইল চেয়ারের চাকাটা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঋতুর কাছে এসে বলল - এত খেটে খুটে এসে আর ইচ্ছে করে তোমার, আমাকে গান শোনাতে?

ঋতু একটু হেসে বলল - করে ব‌ইকি‌। খুব করে। কেন বিয়ের পর প্রতিটা সন্ধ্যে তোমাকে আমি গান  শুনিয়ে আসছি। আর তার জন্য তুমি আমাকে মার্কস দিয়ে আসছ। এখন তার অন্যথা হবে কেন?

রজত ঋতুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে - তখন সময়টা অন্য ছিল ঋতু।

- সময় অন্য থাকনা, আমরা তো এক‌ই আছি রজত।

- তখন আমি অফিস করতাম আর তুমি ঘর সামলাতে। আর এখন তুমি অফিস কর আর আমি ঘর‌ও সামলাতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয় এই পা দুটোকে কেটে ফেলে দিই। বেকার বোঝা হয়ে আমার শরীরে ঝুলছে।

ঋতু উঠে গিয়ে রজতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল - আমার দিকে তাকাও।

রজত মুখটা নীচু করে রেখেছে। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। পা দুটো অকেজো হয়ে, বোঝা হয়ে শরীর থেকে ঝুলছে রজতের। সেই একটা আক্সিডেন্ট, রজত আর ঋতুর জীবনের একটা মোড়।

বাবা মায়ের অমতে রজতকে বিয়ে করেছিল ঋতু। রজতের আপন বলতে তেমন কেউ ছিলনা। বাবা মা সেই ছোটবেলায় গত হয়েছেন। ঠাম্মির কাছে মানুষ রজত। তারপর একসময় ঠাম্মিও চলে গেল। তারপর ঋতু রজতের জীবনে এলো। ঋতুকে আঁকড়ে বাঁচতে শুরু করল ছেলেটা। তারপর একদিন সবটা কেমন উলোট পালোট হয়ে গেল।

ঋতু রজতের থুতনি টা ধরে তুলে বলল - তাকাও আমার দিকে।

রজত ভিজে চোখে তাকাল ঋতুর দিকে। এই তাকানো সবসময় ঋতুর মনে ঝড় তোলে। তখন পৃথিবীর সব জিনিস, সব মানুষ মিথ্যে মনে হয়। এই চাওনিই ঋতুকে রজতের এত কাছে এনেছিল। আর আজও ধরে রেখেছে।

ঋতু বলল - বিয়ের দিনে জীবনসঙ্গী হ‌ওয়ার শপথ নেওয়ার সময় আর‌ও কয়েকটা শপথ নিয়েছিলাম আমরা। একে অপরকে কোন সিচুয়েশনেই ছেড়ে যাবনা। আজ যদি অ্যাক্সিডেন্ট টা তোমার না হয়ে আমার হত, তুমি কি আমায় ছেড়ে দিতে?

রজত বলল - একসাথে থাকার শপথের সাথে সাথে আমি বৌভাতের দিনে আরও একটা শপথ নিয়েছিলাম ঋতু তোমার ভাত কাপরের দায়িত্ব আমার। সেটা পালন করতে পারছি ক‌ই?

ঋতু রজতের মাথায় হাতটা বুলিয়ে বলল - ধরে নাও আজ আমাদের বৌভাত। আর আজ আমি শপথ নিচ্ছি তোমার সারাজীবনের ভাত কাপড়ের দায়িত্ব আমার।

রজত ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল।

-পৃথিবীর সবাই যেন তোমার মত জীবনসঙ্গী পায় ঋতু।।

ঋতু রজতকে জড়িয়ে ধরল। নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে একটা নতুন শপথ নিল ঋতু। যে শপথ সমাজের নিয়মকে মান্য করেনা। যে নিয়ম কোন লোহাড় শেকলে আবদ্ধ নয়। যে নিয়ম কেবল ভালোবাসার, দায়িত্বের।

ভাত কাপড়ের দায়িত্ব কেন একা ছেলেরা নেবে? এখন তাদের সাথে তাল মিলিয়ে মেয়েরাও চলছে। কোন অংশে কমতি নেই মেয়েদের। তাই জীবনসঙ্গী মানে আলাদা আলাদা শপথ নয় এক‌ই শপথ দুজনকে দুজনের মত পালন করা।

আরও পড়ুনঃ পথের পাঁচালি আসলে অপু না দুর্গার গল্প?