মুক্তো বৃক্ষ - স্বামীজির মহাপ্রয়াণ

স্বামীজির মহাপ্রয়াণ

রাজকুমার মাহাতো

স্বামী-বিবেকানন্দের-রচনা-rajkumar-mahato-swami-vivekananda-bengali-blog-স্বামিজি-মৃত্যু-রহস্য-মনিষী-রচনা


মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। গঙ্গায় জোয়ার। কৃষ্ণচূড়ার গাছগুলো তাকিয়ে হাসছে তাঁর দিকে। কয়েক কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি খসে পড়ছে ডাল থেকে। একটা কাঠঠোকরা ঠুক ঠুক করে ঠুকে চলেছে কৃষ্ণচূড়ার গুঁড়ি। স্বামী অভেদানন্দ এসেই "হেই হেই" শব্দে কাঠঠোকরা কে তাড়াতে চাইল। স্বামীজী মানা করলেন। " না না, এ কি করছ তুমি?"

শিষ্য অভেদা‌নন্দ বললেন " ওতো ঠুকরে গাছটার ক্ষতি করছে স্বামীজি।"

বিবেকানন্দ হাসলেন, বললেন " ও নিজের বাসা বানাচ্ছে। আপন কাজ করছে ও। ওকে বাধা দেওয়া উচিত নয়। আসলে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। ঠোকরানো ওর কাজ। চেয়ে দেখো, গাছটা কেমন হাসছে। তার ব্যথা নেই।‌ কারন, সে জানে সবটা।"


শিষ্য মাথা নিচু করে প্রনাম করে বসলেন। বেলুড় মঠের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে। অনেক কথা হল তার স্বামীজির সাথে।

সেইদিন স্বামীজি তাকে বলেছিলেন " বুঝলে অভেদানন্দ আমি আর বছর পাঁচেক বাঁচব।"

শিষ্য অবাক হয়ে বলেছিলেন " এ কি বলছেন আপনি? আপনাকে এখন‌ অনেক বছর বাঁচতে হবে। আরও অনেক কাজ করতে হবে। এসব বলবেন‌ না‌।"

স্বামীজি হেসেছিলেন আর বলেছিলেন " আমার আত্মা দিন‌ দিন‌ বৃহৎ থেকে বৃহৎতর হয়ে উঠছে। আমার শরীরে ওঁকে বেশিদিন‌ ধরে রাখা যাবেনা। আর মানুষের কল্যাণ করার জন্য আমাকে আরও শতবার জন্ম নিতে হলে, নেব। আশীর্বাদ করি, তোমরা অনেকে মানুষের কল্যাণ করো। ফতুর হয়ে যাও মানুষের কল্যাণে। নিজেকে সঁপে দাও জীবে প্রেম করার উদ্দেশ্যে।"

হ্যা, এই দিনের‌ ঠিক পাঁচ বছর‌ পরেই আজকের দিনে মহাপ্রয়াণ হয় তাঁর। আসলে তিনি জানতেন তাঁকে মৃত্যুদূত নিতে এসেছে। চাইলে ফেরাতেও পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।  হাসিমুখে তার আত্মাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। অনন্ত আকাশে উড়তে। 

মৃত্যুর দুইদিন আগে অর্থাৎ ২রা জুলাই নিবেদিতাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন বেলুড় মঠে। কিন্তু সেদিন তিনি উপবাস পালন করেছিলেন। বিভিন্ন ফলমূলাদি খেতে দিয়েছিলেন নিবেদিতাকে। আর তারপর তিনি যেটা করেছিলেন সেটা অবিশ্বাস্য। খাওয়ার পর তিনি নিজে নিবেদিতার হাত ও পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন। 

নিবেদিতা অবাক চোখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন " এ কি করলেন আপনি? এটা তো আমার করার কথা।"

স্বামীজি বলেছিলেন " যিশু তার শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন মনে পরে?"

নিবেদিতা আর‌ও অবাক হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন " সে তো ওঁর মৃত্যুর দু'দিন‌ আগে।"

স্বামীজি হেসেছিলেন। কোন‌ কথা বলেননি। কেবল তাকিয়ে ছিলেন নিবেদিতার দিকে।

১৯০২ সালের ৪ই জুলাই সকাল থেকে তিনি খোশ মেজাজে ছিলেন। খাওয়া দাওয়া করে সন্ধ্যা ৭ টা নাগাদ তিনি ঘরে যান। বলে গিয়েছিলেন " আমাকে কেউ যেন বিরক্ত না করে।" ধ্যানে বসেছিলেন তারপর। আর ওঠেন নি। রাত ৯:১০ নাগাদ তিনি নিজের রক্ত মাংসের শরীর ছেড়ে দেন। আত্মাকে উড়িয়ে দেন মুক্ত আকাশে।

ডাক্তার বলেছিলেন মস্তিস্কের নার্ভ ফেটে মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পেছনে আসলে কি কারণ, সেটা আজও স্পষ্ট নয়। কিছু রহস্য নাহয় রহস্যই থাক। আসলে তাদের জন্ম মৃত্যু আমরা চাইলেও বিশ্লেষন করতে পারব না। আজও না, কালও না, কোনদিনই নয়।