ছোটগল্প - রংতা দেবীর জোগাড়

রংতা দেবীর জোগাড়

রাজকুমার মাহাতো

বাংলা-গল্প-সাহিত্য-বাংলা-গল্প-কবিতা-গল্প-কবিতা-ব্লগ-অনলাইন-সাহিত্য-ম্যাগাজিন-ম্যাগাজিনের-গল্প-Rajkumar-mahato-blog-bengali-popular-blog-little-magazin
ছবি ঃ ইন্টারনেট  এডিটঃ রাজকুমার

সার্চগুলি ঃ বাংলা গল্প সাহিত্য, বাংলা গল্প কবিতা, গল্প কবিতা ব্লগ, অনলাইন সাহিত্য ম্যাগাজিন, ম্যাগাজিনের গল্প


নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ এ নির্বাচিত ছোটগল্প 

(১) 

স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজল। পড়ুয়াদের ভিড়ে ঢেকে গেল স্কুল প্রাঙ্গণ। কার ক্লাসে আজ কে বেতের কতগুলো ঘা খেয়েছে, কে পুরো ক্লাস কান ধরে বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে ছিল, কোন স্যার পড়া ধরা-কালীন কতবার হাঁচি করেছে অথবা আগামী কালের পড়া একদিনে কিভাবে হবে সেই নিয়ে গভীর আলোচনা করতে করতে সবাই বাইরে আসছে। 

পাবক বড় বট গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে শিবুর অন্য অপেক্ষা করছিল। পাবক সবেমাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে এগারো ক্লাসে উঠেছে।ফর্সা, টিকালো নাক মাথা ভর্তি কালো চুল, বেশ লম্বা চেহারায় পাবককে একজন সুপুরুষ বলা চলে।যদিও সে এখন কিশোর। বাবা বন-দফতরের উচ্চপদে কর্মরত। দু-মাস আগে বদলি হয়ে এসেছে পুরুলিয়ায়। পুরুলিয়া শহর থেকে প্রায় কয়েক কিলোমিটার দূরে পারদি গ্রাম। অযোধ্যা পাহাড় রেঞ্জের জঙ্গলের শুরুতেই এই গ্রাম। সমতলের শেষ আর পাহাড়ের শুরু এই মধ্যস্থলের ছোট্ট গ্রাম পারদি। যাতায়াতের জন্য পিচের শক্তপোক্ত রাস্তা থাকলেও যানবাহন একেবারেই নেই বললেই চলে। বীরেন বাবুর নিজস্ব গাড়ি থাকায় অসুবিধা হয়ত হতনা কিন্তু তিনি বিলাস-বহুল জীবনযাত্রায় একেবারে অভ্যস্ত নয়। আর নিজের একমাত্র ছেলে পাবককেও বিলাসিতা থেকে কয়েকশ ক্রোশ দূরে রেখেই মানুষ করেছেন চৌধুরী দম্পতি। পাবকের মা লীলা দেবী একেবারে সাধারণ ঘরের মেয়ে। তাই বীরেন বাবুর এরূপ অভ্যাস মেনে নিতে তার কোন অসুবিধা হয়নি। পাবক গ্রামের সাধারণ সরকারি স্কুলেই ভর্তি হয়েছে, গ্রামের আর পাঁচটা ছেলেদের মতই সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করে। এই দুই মাসে সাইকেলটা নিয়ে সে এই পলাশ পাহাড়ের অনেক উপরে পর্যন্ত ঘুরে এসেছে। ক্লান্তি লাগেনা তার। এই অপরূপ পাহাড়ের সবুজ গাছপালা গুলো তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ছোট ছোট নাম না জানা ঝরনা আবিষ্কার করে সে তার মিষ্টি জল পান করে, বোতলে ভরে নিয়ে আসে। বীরেন বাবু আর লীলা দেবীও সানন্দে সেই জল পান করে। কোন কাজেই কোনদিন পাবককে বাঁধা দেয়নি চৌধুরী দম্পতি। তার যখন যা মন চায় সে তাই করে। এখন তো তার কৈশোর কাল, ছোটবেলাতেও খুব একটা বাধা-বিপত্তি আসেনি তার কোন ইচ্ছেয়। 

গতবছর কলকাতায় থাকাকালীন পুজোতে বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে একঢোক বিয়ার গলায় ঢেলেছিল পাবক। তারপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঠাকুর দেখা শিকেয় তুলে বন্ধুরা ক্যাবে করে যখন বাড়িতে পৌঁছাতে এলো তখন প্রায় রাত দুটো। লীলা দেবী দরজা খুলেই কয়েকটা ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখ আর নেতিয়ে পরা পাবককে তাদের কোলে দেখে চমকে গিয়েছিল। ভিতরে এসে সোফায় পাবককে শুইয়েই একজন হাত জোড় করে বলে উঠল “ক্ষমা করে দিন কাকিমা, আসলে আমরা জানতাম না। একঢোক বিয়ার খেয়ে ওর এই অবস্থা হবে। খুব লজ্জিত আমরা।“  প্রথমটা মুখটা গম্ভীর করে থাকলেও মিনিট দুই পরেই হাসিটাকে আর চেপে রাখতে পারেননি লীলা দেবী। খিলখিলয়ে হেসে উঠেছিলেন আর সবাইকে অবাক করে বলেছিলেন “তোমরা পেরেছ তাহলে ওঁকে টেস্ট করাতে, সেটাই বা কম কি?” অবাক হয়ে বন্ধুরা তাকিয়ে ছিল পাবকের মায়ের দিকে। তার পর থেকে ওসব নেশার জিনিস আর ছুঁয়েও দেখেনি পাবক।

শিবু এসে পাশে দাঁড়িয়ে বলল - চল, আজকে একটু পাহাড়ে ঘুরে আসি। তোদের কলকাতায় পলাশ হয়? আমরা এই সময় পালাশে ঢেকে থাকি।

পাবক মুচকি হেসে হালকা করে সাইকেলে প্যাডেল মারে। সাইকেল গড়াতে শুরু করে।পাহাড়ি রাস্তায় এই তপ্ত রোদের দুপুরে লাল মাটিতে সাইকেল চালিয়ে পাবকের নিজেকে এখানের সেই কঠিন পাহাড়ি মানুষই মনে হয়। শিবুর দিকে তাকিয়ে বলে - এখন পলাশ আর তোর একার নয়। আমারও।

শিবু হেসে বলে - ঠিক ঠিক। 

এখানে আসার পর স্কুলে পাবকের অনেক বন্ধু হয়েছে, যাদের মধ্যে শিবু একটু বেশিই ভালো। এখানের গ্রামের ছেলে। তবে দেখলে মনে হয়না।বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা ,গায়ের রং শ্যামবর্ণ। টিকালো নাক আর মাথা ভর্তি কালো কোঁকড়ানো চুলে শিবুকে শহুরে বলেই মনে হয়।

পাবক হেসে মুখটা সামনের দিকে করে জোড়ে প্যাডেল মেরে এগিয়ে গেল। সবুজ পাহাড় ডাকছে তাদের। সারা বিকেলটা চষে বেরাল তারা এই সবুজের জঙ্গলে। শাল-পিয়াল-পলাশের সাথে আরও ভালো করে পরিচয় হল পাবকের।

পড়ুন নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ এর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করা গল্প - কামিনী কথা

(২)

দুধেল কুয়াশায় চারিদিক ঢেকে আছে। শীত চলে গিয়ে এই সময়টা এক-দু দিন এখানে দারুণ কুয়াশা থাকে ভোরের এই সময়টা। অনেক বেলা অবধি সেই কুয়াশা উড়ে বেরায় পাহাড়ের এক চূড়া থেকে আর এক চূড়ায়। আজ রবিবার। টিউশন, স্কুল সব ছুটি। একেবারে ভোর বেলা সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে পাবক। কয়েকটা পাহাড়ি রাস্তার মোড় পেরিয়ে, হাওয়ার বিপক্ষে গিয়ে এগিয়ে এসেছে বেশ অনেকটা পথ জংগলের ভিতরে, পাহাড়ের উপরে। এই স্নিগ্ধ ভোরের হালকা হাওয়া, মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক, পাতা ঝরার খসখস আওয়াজ সব মিলে ক্লান্ত হতে দেয়নি তাকে। এগোতে এগোতে সে একটা জায়গায় গিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়লার আঁচের শেষ ধোঁয়ার মত কুয়াশায় কিছুটা দূরে একটা গ্রাম দেখতে পেল। ঠিক লেখকের গ্রাম বাংলার বর্ণনার সেই স্বপ্নের গাঁয়ের মত। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পাবক। 

লাল মাটির রাস্তার ধারে কিছুটা ছাড়া ছাড়া বেশ কয়েকটি বাড়ি।মাটির মোটা দেওয়াল গুলোতে সাদা ও লাল রং দিয়ে আঁকা কলকা ডিজাইন। গ্লাস টালির ছাউনি আর উঠানে ঝড়ে পড়া পাতার মোটা প্রলেপ দেখে বুঝতে পারল এই গ্রামে বহুদিন হয়ত কেউ আসেনি। বাড়িগুলোতে গোবরের ন্যাতা দেওয়া হয়নি তাই মাটির দেওয়াল গুলো ফেটে-ফেটে গেছে। দেখতে দেখতে যেন হারিয়ে গিয়েছিল পাবক, এগিয়ে যাচ্ছিল সামনের দিকে। এই পরিত্যক্ত গ্রামে যদি কোন মানুষের দেখা পায়। সেই আশা নিয়েই এগিয়ে গেল বেশ কয়েক পা।

 হঠাৎ একজনের গলার স্বরে হুশ ফিরল তার । “কার ছিলা র‍্যা তুই?” পিছন ফিরে পাবক দেখল একজন বৃদ্ধা তাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করেছে। বৃদ্ধার সাদা চুলে জটা পরে গেছে, পরনে একটা সাদা শাড়ি। সেটাও হাঁটুর উপর তোলা। গায়ের রং কালো কুচকুচে, মাথার চুলগুলো একেবারে সাদা। গলায় বেশ মোটা একখানা চকচকে হার। রুপোর কিনা বুঝতে পারেনা পাবক। সারা শরীরের চামড়া ঝুলে গেছে। ঝোলা চামড়ার হাতে একখানা লাঠি। সেই লাঠিটাই এখন বৃদ্ধার পা।জীর্ণ শরীরের সম্পূর্ণ ভরটাই সেই লাঠির উপর।

পাবক একটু চমকে উঠে, ভয় পেয়েই উত্তর দিল “ আসলে আমি, আমি…………”

বুড়ি মুড়ে আসা চোখে তাকিয়ে বলল “ আমার পিঙ্গল লাকি র‍্যা তুই? ও পিঙ্গল আমারে দেখতি এয়েছিস লাকি বাপ?”

কে পিঙ্গল, আর কেইবা এই বৃদ্ধা, আর কেনইবা পাবক এখানে। এখানে যদি সেন্টিমেন্টাল দ্বীপের মত সেই আদিবাসী গোষ্ঠী থাকে। যদি তাকে তীর ছুঁড়ে মেরে ফেলে। অথবা এরা যদি মাওবাদী হয়? যদি তাকে বন্দি করে মুক্তিপণ চায়। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে সাইকেলটা ঘুরিয়ে আবার ফিরে আসতে যায় পাবক। কিন্তু বুড়ি সামনে দাঁড়িয়ে আবার বলে ওঠে “ ও পিঙ্গল তুর জন্য চালভাজা রেখিচি। আয়না বাপ, একমুঠো খেয়ে যা। কবে থেকে আসিস নি এই বুড়ির কাছে। সব্বাই আসে তুই আসিস নি। ক্যান র‍্যা? আর একটু পরেই হয়ত কোন লোক চলে আসবে তখন তো আর আমায় পাবিনি তুই। ও পিঙ্গল আয়না বাপ আমার।“ পাবক কিছু ভাবার আগেই বুড়ি সামনের দিকে এগিয়ে চলে। পাবকও তাকে অনুসরণ করে তার পিছনে যায়, যদিও ইচ্ছে হয়েছিল একবার, সাইকেলটা জোড়ে চালিয়ে পালিয়ে আসুক কিন্তু মন মানে না তার। বুড়িকে কেমন যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে তার। মনে হয় হয়ত বুড়ি তারই খোঁজে ছিল এতদিন। 

গ্রামটার এক কোনে একটা টালির ছাদের মন্দির। তাতে একটা মা কালির মূর্তি। তবে সেই মূর্তিটা একটু অন্যরকম। মানে যেমন অঞ্চল ভিত্তিক ভাষার তারতম্য দেখা যায়, ঠিক তেমনি অঞ্চল ভিত্তিক মায়ের রূপের তারতম্যও দেখা যায়। মা’কালী তো সেই একটাই, কোথাও তিনি শ্যামা, কোথাও চামুণ্ডা আবার কোথাও দক্ষিণা নামে পূজিত। মূর্তির পাশে রাখা একটা পাথরের খালি বেদি। মন্দিরের বারান্দায় একটা কাঠের চৌকি পাতা। তাতে বেশ মোটা করে বিছানা করে রাখা, পাশে একটা মাটির কলসই তার উপর উপুড় করা একটা কাঁসার গ্লাস। সেই কলশীর পাশে রাখা একটা কাঁসার বাটি , চকচকে একটা কাঁসার থালা দিয়ে ঢাকা।

আশেপাশে তাকিয়ে দেখল পাবক। গভীর শাল,পিয়াল আর পলাশ গাছ বেষ্টন করে রেখেছে মন্দিরটাকে। কাছাকাছি হয়ত কোন ঝরনাও আছে, স্পষ্ট জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটা আলাদা নীরবতা ঘিরে আছে চারিদিকে। একটা ছেঁড়া আসনে পাবককে বসতে দিল বুড়ি। কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁসার থালাটা তুলে বাটিটা নিয়ে পাবকের দিকে এগিয়ে বলল “ একজন পুজো দিতে এসে এই চালভাজাটুকু দিয়ে গেচিল। রেখে দে ছিলুম তুর জন্য। চিব্বে নে দিকি কড়মড় করে।“ পাবক বাটিটা হাতে নিয়ে একমুঠো চালভাজা হাতে তুলে মুখে দিল। বেশ খেতে, একেবারে কুড়কুড়ে। বুড়ি সেই তক্তার উপর বসে পাবকের দিকে তাকিয়ে বলল “ আবার আসিস কিন্তু পিঙ্গল, আমি তুর অপেক্ষা করব বাপ।“ পাবক নিজের পরিচয় দিলনা। মনে মনে ভাবল পিঙ্গল বুড়ির কোন আপনজন বোধহয়। সে যদি তাকে আপন ভেবে ক্ষণিকের সুখ পায়, ক্ষতি কি। এই কয়েক মুহূর্তে বুড়ি যেন পাবকের অনেকটা অংশ দখল করে নীল। কেন, কিভাবে পাবকের কাছে তা অজানা। 

তারা আসলেই মুক্তো - জানুন তাদের - মুক্তো বৃক্ষের পেজ দেখুন

(৩)

পাহাড়ে পলাশ শেষের মুখে। এখন প্রায় দু-একদিন ছাড়াই পাবক আসে বুড়ির কাছে। বুড়ি সেদিন পাবককে বলেছে “ পিঙ্গল বাপ আমার। শনি আর মঙ্গলবার আসবিনে বাপ এখানে।“ পাবক বুঝতে পারেনি কেন তাকে বুড়ি এই দুইদিন আসতে বারণ করেছে। 

বুড়ি এখন পথ চেয়ে বসে থাকে পাবকের জন্য। পাবকও বুড়ির কাছে যাওয়ার জন্য উৎসুক হয়ে থাকে। বুড়ি কলা, পেয়ারা আপেল আরও কত রকমের ফল রাখে পাবকের জন্য। পাবক শিবুকে বলেছে এই বুড়ির ব্যাপারে। শিবুও দু-একবার এসেছে তার সাথে বুড়ির কাছে। কিন্তু শিবুকে বুড়ির যেন ঠিক মনঃ-পূত হয়নি। যে দু-দিন শিশু এসেছিল সেই দু-দিন বুড়ি পাবকের সাথে ভালো করে কথাও বলেনি। তাই শিবুকে আর নিয়ে আসেনা পাবক। একাই আসে। 

কিশোর মনে অজানাকে জানার আগ্রহটা বেশি থাকে। যা কিছু অসাধ্য মনে হয় তাকে সাধ্য করার জন্য উৎসুক হয়ে ওঠে এই সময় মন। পাবকেরও এখন ঠিক সেই অবস্থা। বুড়ি কেন তাকে শনি- মঙ্গলবার যেতে বারণ করেছে। সেটা জানার কৌতূহল পাবককে সেদিন টেনে নিয়ে গেল বুড়ির মন্দিরে।

দিনটা শনিবার। স্কুল থেকে বেড়িয়ে পাবক শিবুর সাথেও দেখা করেনি সেদিন। সাইকেলটা নিয়ে সোজা ছুটে গেল সেই পাহাড়ের মন্দিরে। মন্দির থেকে বেশ খানিকটা দূরে সাইকেলটা একটা গাছে হেলান দিয়ে দেখতে থাকল পাবক। সেই মন্দিরে জনা দশেক পুরুষ মহিলার ভিড়। শাঁখ-ঘণ্টা বাজিয়ে পাহাড়ি কালির আরতি হচ্ছে কিন্তু বুড়িকে কোথাও দেখা গেলনা। এগিয়ে গেল পাবক মন্দিরের দিকে। মন্দিরের বাইরে এসে সেখানে থাকা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখল। মন্দিরের ভেতর মায়ের মূর্তির পাশে বসে সেই বুড়ি। পুরোহিত পঞ্চপ্রদীপ দিয়ে মায়ের বিগ্রহের সাথে সেই বুড়িরও আরতি করছেন। চোখ বন্ধ করে সেই পাথরের বেদির উপর বসে আছে বুড়ি। আরতি শেষে সবাই বুড়ির পায়ে নমস্কার করছে, পাশে রাখা কত ধরনের ফল। চালভাজা, চিঁড়ে, মুড়কি। ধুপ আর ধূনার গন্ধে চারিদিক মম করছে। বুড়ির পায়ে হাত রেখে কেউ বলছে “মা’গো আমার ছেলেটাকে একটা চাকরি দাও মা। “ আবার কেউ বলছে “ মা’গো আমার মাইয়ার জন্যি একটা ভালো ছিলা দেখে দে মা।“বুড়ির চোখ বন্ধ, কেবল ঝোলা চামড়ার হাতটা সবার মাথায় ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করছে সে।

এত কিছু দেখার জন্য পাবক কোনমতেই তৈরি ছিলনা। মনের ভেতর তখন হাজার প্রশ্নের ভিড়। যাকে সে এতদিন দেখে এসেছে সেই এই বুড়ি? সবাই এইভাবে পুজো করছে কেন তাকে? মায়ের মূর্তির সাথে তার আরতি হচ্ছে ! ব্যাপারটা কি? এই ধরনের নানা প্রশ্ন বিচলিত করে তুলল পাবককে। 

কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই চলে গেল সেখান থেকে। রয়ে গেল পাবক, সেই বুড়ি আর মা পাহাড়ি কালি। আরও মিনিট দশেক পর বুড়ি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল পাবক সেই ছেঁড়া আসনটা পেতে দাওয়ার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে বুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। মুচকি হেসে বুড়ি বাইরে বেড়িয়ে এসে সেই কাঠের তক্তায় বসে বলল “ তুকে না বলেচিলুম আসবিনে শনি মঙ্গলবার। “ পাবকের মুখটা তখন লাল হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো ফেটে জল আসতে চাইছে কিন্তু তার মুখ ফুটে কোন কথা বের হচ্ছে না। বুড়ি এক দৃষ্টিতে পাবকের দিকে তাকিয়ে। আরও কিছুক্ষণের মৌনব্রত পালন করল দুজন। কেবল সেই না দেখা ঝরনার আওয়াজ আর হালকা হাওয়ায় পাতাগুলো ঝড়ে পড়ার আওয়াজ কানে আসছিল।

কিছুক্ষণ পর বুড়ি নিজেই বলতে শুরু করল “ আমি তখন এই গাঁয়ের বউ হয়ে এয়েচি। গোলা ভরা ধান, ঝুড়ি ভরা সবজি সব থাকত আমার ঘরে। আমি আর আমার মরদ থাকতুম একটা কুঁড়েতে। খুব ভালবাসত উঁ আমায়। প্রতি বছর একবার করে এই পাহাড়ি মায়ের মন্দিরে জাঁকজমক করে পুজো হত। মেলা বসত। মাটির পুতুল কিনে দিত। মাথার খোঁপায় পলাশ লাগিয়ে দিত। খুব ভালো ছিলুম জানিস পিঙ্গল আমরা দুজন।“ বুড়ি থেমে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইল পাবকের দিকে। পাবক বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল “ তারপর।“

বুড়ি আবার বলতে শুরু করল “ সে বছর গাঁয়ে মড়ক লাগল। অজানা জ্বরে এক এক করে মরতে লাগল সব। গায়ে সেই জ্বর নিয়েই সে বনে গেছিল কাঠ কাটতি। কত বারণ করেছিলুম কিন্তু আমার কথা শোনেনি। আর ফিরে আসেনি, পরদিন খুঁজতে গিয়ে দেখলুম পলাশের তলায় পড়ে রয়েছে। প্রাণ ছিলনা সে দেহে। হাত-পা শক্ত হয়ে কাঠ হয়ে গেচিল। শরীরে পাহাড়ি পিঁপড়েরা বাসা বেঁধেছে ততক্ষণে।  আমি বেঁচে রইলুম এই মড়কের সাক্ষী হয়ে। “ আবার চুপ করে গেল বুড়ি। পাবক তখনও কৌতূহল মুখে তাঁর দিকে তাকিয়ে। দু-পক্ষেরই চোখের কোনে জল চিকচিক করছে। বুড়ি কাঠের তক্তা থেকে নীচে নেমে এলো। পাবকের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল “ পিঙ্গল বাপ আমার। কাল আসবি তো? “ পাবক মুখটা নামিয়ে বলল “ বাকিটা?” বুড়ি আঙুল তুলে বাইরের দিকে দেখিয়ে বলল “ দেখ বাপ, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আজ বাড়ি যা বাপ আমার। বাকিটা নাহয় কাল শুনিস।“ আর কোন কথা বলেনি পাবক। দূরে পাহাড়ের মাঝে ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসা লাল সূর্যটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল বাড়ির পথে।

পড়ুন ছোটগল্প - সম্মান

(৪)

দেখতে দেখতে পাহাড়ে বর্ষা কেটে- লাল মাটির গরম কেটে আবার ঘুরে কোকিল ডাক দিল। আবার গাছের সব পাতা নিজেদের ঝড়িয়ে দিল পলাশের লাল দেখাবে বলে। পাবক এখন প্রতিদিন আসে রংতা বুড়ির কাছে। বাপ মা সাধ করে নাম দিয়েছিল রংবতী। নিচের বাঙালি গ্রামে জন্ম হয়েছিল সে এক বর্ষার রাতে। সে কি ঝড়-বৃষ্টি। ফুলে ফেঁপে উঠেছিল নাম না জানা কত ঝরনা। বাঁধগুলো প্রাণপণে আঁটকে রেখেছিল বিশাল বিশাল জলাধার গুলোকে। বর্ষার এত রূপের মাঝে উজ্জ্বল রোদের মত জন্ম হয়েছিল রংরতীর। বাপ মহুয়া খেয়ে নেচেছিল। কতকেঊ দেখতে এসেছিল তাকে। তারপর বাপের সে কি কাজ। পুরুলিয়া শহরের স্কুল থেকে ডাক এলো স্কুল পরিষ্কারের কাজের জন্য। সংসারে অভাব বলতে আর কিছু রইল না। তারপর এক এক করে দীর্ঘ পনেরোটা বসন্ত পেরিয়ে এ গাঁয়ে আসা। বাপ মায়ের অমতে সাঁওতালি ছেলেকে বিয়ে করেছিল রংবতী। তাই বাপ-মা আর কোনদিন তার মুখটাও দেখেনি। এখানেও স্বামীর তিনকুলে কেউ ছিলনা। সংসারটাকে মনের মত সাজিয়েছিল। তারপর সময়ের সাথে সাথেই আবার এক এক করে সব হারিয়ে বসে থাকল একা রংবতী।

এখন মঙ্গল কি, আর শনি কি, যে কোন দিনেই পাবক আসে এখানে। কাটিয়ে যায় একটা ভরা দুপুর অথবা একটা মনমরা বিকেল। নানা রকম ফল খেয়ে যায়। পরিবর্তে কিছুই দিতে পারেনা সে। এই নিয়ে তাঁর আক্ষেপ চরম সীমায়। এমনি এক মঙ্গলবারের দুপুরে পাবক সাইকেলটা গাছে হেলান দিয়ে উপস্থিত বুড়ির মন্দিরে। বুড়ি তখন সবে খেতে বসেছে। ক্ষুদের চালের ভাত,তাতেই ডাল আর কিছু সবজি দিয়ে হলুদ ছাড়া লবণ ছাড়া খিচুরি। আগেও বুড়িকে এই খাবার খেতে দেখেছে পাবক। আজ যেন বড় খারাপ লাগছে তার। বুড়ি ভালবেসে নিজের সব ফল গুলো তাকে খেতে দিয়ে দেয় তার পরিবর্তে সে বুড়িকে কিছুই দিতে পারেনা। বুড়ি নিজেই বারণ করেছে। তার এসব বাইরের খাওয়া চলেনা। কেন চলেনা সে প্রশ্নের উত্তর যদিও এখনও অজানা পাবকের কাছে।

পাবককে দেখে বুড়ি খাওয়া ছেড়ে উঠে আসনটা পেতে দিল। “এয়েছিস পিঙ্গল। আয় বাপ আমার, তোর কথাই ভাবছিলুম।“

পাবক মুখটা শুকনো করে বলল “ প্রতিদিন এই আলুনি খিচুরি খেতে ভালো লাগে তোমার?”

বুড়ি ফোকলা দাঁতে হো হো করে হেসে উঠে বলল “ আমার যে আমিষ খেতে নেই বাপ।“

পাবক উঠে দাঁড়িয়ে বলে “ কেন?”

বুড়ি কিছু না বলে খেতে থাকল। হয়ত খুব খিদে পেয়েছে। পাবক মুখটা নিচু করে বলল “ তুমি আমাকে কত ফল দাও, চালভাজা দাও। আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারিনা। আমার দুঃখ লাগে। কষ্ট লাগে।“

বুড়ি হেসে বলল“ তুর থেকে আমি ওসব কিছু লিবনা রে বাপ। তুর থেকে আমি ঠিক সময়মত আমার প্রাপ্য চেয়ে লিব। দিবিতো আমায়?”

পাবক মুখটা শুকনো করে বলে “ আমার কাল পরীক্ষা শেষ। বাবা আবার বদলি হয়েছে জলপাইগুড়িতে। আমি আর পাঁচদিন এখানে আছি। তারপর চলে যাব। কখন আর চাইবে তুমি?”

কথাটা শুনে বুড়ির মুখটা একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মুখ নাড়াও বন্ধ করে দিল সে। আশেপাশের পাতাঝরা বন্ধ হয়ে গেল। সেই ঝরনার আওয়াজটাও আর কানে এলনা বুড়ির। একভাবে তাকিয়ে রইল পাবকের দিকে। অনেকক্ষণ, কতক্ষণ তারা নিজেরাও জানেনা। পাবক মুখটা নিচু করে বলল “ বুড়ি, আমাকে আর দেখতে পাবেনা। মনে থাকবে তো আমায়?” কেঁদে ফেলল বুড়ি। পাবকের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে খোনা স্বরে বলল “ মনে রাখার দরকার পড়বেক লাই বাপ। তুই একবার কাল আসিস এথা। তুকে অনেক কিছু বলব আমি। আসবি তো বাপ, ও পিঙ্গল আসবি তো?” পাবক বুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল “ আসব।“

পাবক জানেনা এই রংতা বুড়ির সাথে তার কি সম্পর্ক। কেন, কিসের টানে সে এই জঙ্গলের ভিতর এই বুড়ির কাছে বারবার আসে! চালভাজা খেতে নাকি ফল খেতে। ঘরে রাখা ফল তার মুখে রোচে না। আর বুড়ির দেওয়া ফল কত আনন্দ নিয়ে খায় সে।  

(৫)

দু-দিন রাতে ঘুম হয়নি পাবকের।এই পাহাড় ছেড়ে এখানকার জঙ্গল ছেড়ে আবার তাকে চলে যেতে হবে অন্য ঠিকানায়। আর কোনদিন হয়ত ফিরবে না সে এই জঙ্গলে। শিবুকে খুব মনে পড়বে তার। এখানকার শাল-পিয়াল-পলাশের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোকে একটা বন্ধ বাক্সে বন্দী করে আবার নতুনের আশায় এগোবে সে সামনের দিকে। সব থেকে মনে পড়বে বুড়ির কথা। তার চালভাজা, তার ঝোলা চামড়ার হাতের সেই মাথায় হাত বোলান। তার সেই ডাক “পিঙ্গল এয়েছিস?” কে প্রতিদিন তাকে দেখতে যাবে। একাই ওই জঙ্গলে পরে থাকবে সে। ভেবেই কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট হচ্ছে পাবকের।

আজ রাতে তাদের ট্রেন। আর কোনদিন আসবে না সে এই বনে। সেই না দেখা ঝরনাটার আওয়াজ আর কোনদিন শুনতে পাবেনা সে। আজ শেষ দেখা বুড়ির সাথে।  কাল বুড়িকে মায়ের থেকে টাকা নিয়ে একটা নতুন কাপড় দিয়েছে পাবক। সেটা পেয়ে বুড়ি যে কি খুশি হয়েছে। তার দু-চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়েছে সেই খুশী। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেছে “ ও পিঙ্গল, বাপ আমার ভালো থাকিস। এই বুড়িকে মুক্তি দিস বাপ। তুর সব ইচ্ছে পূরণ হোক বাপ আমার।“ 

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সাইকেলটা নিয়ে পাহাড়ের মোড় ঘুরে এগিয়ে গেল পাবক। আশে-পাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল তার এই দুই বছরের শাল পিয়াল বন্ধুদের।ঝরে পড়া পলাশেরা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। জঙ্গলটা যেন চেঁচিয়ে বলছে “যাসনা পাবক আমাদের ছেড়ে যাসনা লক্ষ্মীটি।“ কিন্তু তার কাছে কোন উপায় নেই। না চাইতেও তাকে যেতেই হবে। সবাইকেই যেতে হয় একদিন।এই যেমন পলাশও বছরে একবার আসে আবার চলে যায়। পলাশ তবু প্রতিবছর আছে কিন্তু পাবক হয়ত আর আসবে না।

মন্দিরের কাছাকাছি এসে চমকে গেল পাবক। জনা দশেক লোক জড়ো হয়ে আছে আশে-পাশে। তারপরেই মনে পড়ল, আজ তো শনিবার। তাই সবাই পুজো দিতে এসেছে হয়ত। কিন্তু আজ কোন শাঁখ-ঘণ্টার আওয়াজ আসছে না। স্পষ্ট সেই ঝরনার আওয়াজ শোনা যাছে।  সাইকেলটা গাছে হেলান দিয়ে এগিয়ে গেল পাবক। মন্দিরের সামনে গিয়ে সেদিকে তাকাতেই বুকটা খালি হয়ে গেল তার। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। মন্দিরের দাওয়ায় বুড়িকে একটা ছেঁড়া কাঁথার উপর শোয়ানো।পরনে পাবকের দেওয়া সেই নতুন শাড়ি। মাথার কাছে প্রদীপ, ধূপ জ্বলছে। বুড়ির নিথর দেহটা শুয়ে আছে শেষ বিছানায়।  

ধীরে ধীরে বুড়ির পাশে গিয়ে বসল পাবক। দু-চোখ বেয়ে জল পড়ছে তার। বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ির শেষ কথাগুলো তার কানে ভেসে উঠল…………

“মরদটা মরে গেল আমি একা হয়ে গেলুম। ওদিকে মা-বাপ তো কবেই পগার পার। গ্রামের লুটুকে আমি বড় ভালবাসতুম। আমার মরদটাও ওকে ভালোবাসতো। ছোট্ট ছিলাটাকে কাঁধে নিয়া পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াইতুম। সেই ছিলাটার যখন সেই জ্বর হল,আমি পাহাড়ি কালির এই মন্দিরে ধরনা দিয়ে পরে রইলুম। মাকে বললুম তুই উঁকে ঠিক কর নয়ত আমি এখানে তোর সামনে মরবো। জানিনে মা সত্যি শুনছিল কিনা। মায়ের পা ধোয়া জল নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে ছিলে একেবারে ভালো হয়ে গেল। গ্রামের যে ক’জন বেঁচেছিল সবাই মায়ের পা ধোয়া জল খেল। মড়ক সত্যিই গ্রাম থেকে চলে গেল। আর আমাকে এই মানুষ গুলার দেবী বানিয়ে গেল। সেই তবে থেকে এই মন্দিরে দেবীর সাথে উহারা আমারও পূজা করে। একে একে সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। পড়ে রইলুম আমি আর আমার এই পাহাড়ি মা। ধীরে ধীরে আমি রংবতী থেকে রংতা দেবী হয়ে উঠলুম।“

বুড়ি থেমেছিল।সবটাই হাঁ করে শুনেছিল পাবক। কিছুক্ষণ পর বুড়ি আবার শুরু করেছিল। “ও পিঙ্গল, আমি জানি আমার মরার পরে এরা কেউ আমায় আগুন দেবেনা। দেবীকে আগুন দিয়ে কে পাপ লিবে বল। হিন্দু ঘরের মিয়ে আমি। একটু আগুন না পেলি হয়! মরেও ঘুরতি হবে এই পাহাড়ে, মুক্তি পাবক লাই যে। তাই তুকে বলেছিলুম না তুর থেকে চেয়ে লিব। আজ চাইলুম। আমি মরার পর আমার মুখে আগুনটুকু দিয়ে দিস বাপ আমার।“ 

পাবক ভেজা চোখে বলেছিল “কি যে বল বুড়ি। খামোকা এখন মরতে যাবে কেন? তুমি তো দেবী। দেবীরা আবার মরে নাকি?”

বুড়ি হেসে উত্তর দিয়েছিল। “আমাকে দেবী উহারা বানিয়েছে। আর আমি সঙ সেজে মায়ের চরণে বসে গিচি। তা ছাড়া আর উপায় কি ছেল বল? কে আমায় খেতে দিত? কেই বা রাখত? কেউ তো বেঁচে ছেলনা। কথা দে পিঙ্গল আমার মুখে আগুনটুকু দিবি তুই। কথা দে।“ পাবক মাথাটা নিচু করে বলেছিল “ আমার নাম পিঙ্গল নয়, আমার নাম পাবক। এতদিন তোমার এখানে এলাম, কই কোন পিঙ্গলকে তো একবারও দেখলাম না। “ বুড়ি জোড়ে জোড়ে হেসে বলেছিল “ যে পিঙ্গল, সেই পাবক সেই আমার আগুন।“

শিশু ঘাড় ধরে নাড়িয়ে দিল পাবককে। পাবকের ঘোরটা কেটে চোখ থেকে টপটপ করে দু-তিন ফোঁটা জল পড়ল। শিবুকে গতকাল সবটাই বলেছিল পাবক। রংতা দেবীর মরার খবর আশেপাশের গ্রামে ছড়াতে বেশি সময় লাগেনি। খবরটা শুনেই শিশু সোজা এখানে এসেছে। 

সবাই মিলে শাল-কাঠ জোগাড় করল। তারপর মন্দিরের পিছনের সেই ঝরনার ধারে দাহ হল বুড়ির। আগুন দিল পাবক। দু-একজন আপত্তি করেছিল। বলছিল “উঁ দেবী।উঁর কি মরণ আছে? উঁকে রেখে দে বটে, মা আমাদের আবার বেঁচে উঠবেক।“ পাবক মানেনি সে কথা। পুলিশের ভয় দেখিয়ে রংতা দেবীর মুখাগ্নি করল সে। 

আসলে পাবক এতক্ষণে বুঝতে পারল। পিঙ্গল বলে আসলেই কেউ ছিলনা। পাবক নামের অর্থ আগুন আর পিঙ্গল নামের অর্থও আগুন। সে জানত দেবীকে কেউ আগুন দেবেনা। তাই সে নিজের হাতে শেষ আগুন জোগাড় করে গেছে।

পাবক সেই রাতেই ট্রেনে উঠল। পিছনে পরে রইল শাল-পিয়াল-পলাশের সেই পাহাড়, সেই মন্দির, মা পাহাড়ি কালি আর বুড়ির সেই ডাক “ও পিঙ্গল, বাপ আমার…এয়েচিস?” 

 

 সমাপ্ত