কাজলা দিদিঃ স্মৃতিচারণ

কাজলা দিদিঃ স্মৃতিচারণ

ছবিঃ ইন্টারনেট


কাজলা দিদি, যতিন্দ্রমোহন বাগচী, বাংলা কবিতা

ছোটবেলায় ঘরের বারান্দায় পড়তে বসতাম আমি আর ভাই। গোবর দিয়ে লেপা মাটির মেঝেতে ঝ্যাঁতলা বিছানো থাকত। পাশে থাকত টিমটিমে কেরোসিনের আলোর দেওয়ালঘিরি। ঝ্যাঁতলা বলতে বেনা ঘাসের মধ্যে দড়ি দিয়ে বোনা একপ্রকার মাদুরকে বোঝায় আর দেওয়ালঘিরি বলতে হ্যারিকেন গোছের একটি ল্যাম্পকে বোঝায়, যার মাথার দিকটা ফাঁকা থাকে।

যাই হোক, পাশের বাঁশবাগানের মাথায় গোল থালার মত চাঁদ উঠেছিল সেইদিন। আমি আর ভাই পড়ছি। পাশে বসে আছেন নিজের নাম সই করতে না জানা এক শিক্ষিকা, আমার মা। হ্যাঁ নিজে এক অক্ষর পড়াশোনা করেননি কোনদিন। অথচ আমরা কি পড়ছি না পড়ছি, সেদিকে খেয়াল থাকত সবসময়। আসলে, ওই পাশে বসে থাকার ভরসাতে আমরা আমাদের পড়াটা ঠিকঠাক করে ফেলতাম।
সেইদিন জোড়ে জোড়ে পড়ছি আমার খুব প্রিয় একটি কবিতা। আসলে, সেইদিনই ওই কবিতার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল।

“বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?”

পুরোটা পড়লাম মন দিয়ে। মায়ের দিকে একবারও তাকাই নি আমি। কবিতাটা শেষ হতে মা গম্ভীর স্বরে বললেন “আরও একবার পড়।“
আবার শুরু করলাম
“বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,
মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?
পুকুর ধারে লেবুর তলে,
থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,
ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,
মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

আমার মনে আছে প্রায় দশ থেকে বারোবার আমি কবিতাটি পড়েছিলাম সেইদিন। মা একমনে শুনছিল। অন্ধকারের দিকে চলে গিয়েছিল মা। নিজের কান্না লোকাতে, কিন্তু পারেনি। আমি বুঝেছিলাম মা কাঁদছে। কিন্তু কবিতাটা তখন বুঝিনি।
তারপর থেকে পড়তে বসলেই মা কবিতাটি শুনত আমার মুখ থেকে। ধীরে ধীরে সময়ের ঘেরাটোপে চাপা পরে গিয়েছিল কাজলা দিদি। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে সিলেবাসের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল কাজলা দিদি।
আজ রাখীবন্ধন। এতবছর পর মা হঠাৎ করেই আমায় বললেন “সেই কবিতাটা একবার শোনাবি?”
কোন কবিতা আর জিজ্ঞেস করিনি। পড়তে শুরু করেছিলাম কাজলা দিদি। শেষে দেখলাম মায়ের চোখে আবার সেই চেনা কান্নাটা অনেকদিন পর ফিরে এল। আর আমার সেই সিলেবাসের কবিতাটা বোঝার ক্ষমতা আজ হল। ধন্য কবি যতিন্দ্রমোহন বাগচী আর ধন্য এই কবিতা।