চলতি পথে রাস্তায় সিগন্যালে যদি হঠাৎ কোন অতীত সামনে এসে দাঁড়ায়?

সিগন্যাল

রাজকুমার মাহাতো

bengali-blog-signal-story-rajkumar-mahato-chatrak-phollsojja-bengali-fiction

র্ন দিতে থাকা রাস্তায় ছাতিম ফুলেরা বিছানা পেতেছে। দূরের আকাশে মন খুলে হাসছে পূর্ণিমার চাঁদ। জোৎস্নারা খেলা করছে পৃথিবী জুড়ে। অনেকখানি ভালোবাসা বুকে চেপে একা বকটা উড়ে গেল। সাদা ধবধবে। জোৎস্নার আলোয় দেখা গেল পরিস্কার। হয়ত দলছুট হয়েছে ওর। 

এলগিন মোড়ের সিগন্যাল। এখন সাড়ে তিন মিনিট সামনে তাকিয়ে বসে থাকা। আমি স্কুটিতে। লাল স্কুটি। আমার সামনে একটা দৈত্য। বাস। ডানপাশে একটা বাইক। মেয়েটি ছেলেটিকে চুম্বকের মত ধরে রেখেছে। হেলমেট নেই। স্ট্রেট করা চুল। ছেলেটার সামান্য টাক পড়েছে বৈকি। বিবাহিত কিনা বোঝা গেল না। আতস কাঁচ সঙ্গে নেই। থাকলে হয়ত সিঁথিতে একটু উঁকি মেরে দেখতাম। মাখো মাখো ব্যাপার একটা মাইরি।

বাঁ পাশে তাকালাম। অ্যাস কালারের একটা Skoda rapid দাঁড়িয়ে। জানালার কাঁচ নামানো। সামনের সিটে বেশ হ্যান্ডসাম একটি ছেলে স্টিয়ারিং এ হাত দিয়ে বসে। সামনের দিকে‌ তাকিয়ে। পিছনে ঢুঁ মারলাম। ওই চোখ গেল‌ আরকি। সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেলাম স্কুটি নিয়ে। ডানপাশের গাড়িটায় লাগল মাথাটা। হেলমেট পরা ছিল। বেঁচে গেলাম খুব জোড়।

উঠলাম। ওই গাড়িটার পেছনের সিটে তাকানোর সাহস নেই। দু-জন লোক কোথা থেকে অচেনা আগুন্তক এর মত এসে আমার গাড়িটা তুলল। আমি উঠলাম। না, লাগেনি। আমি ওই Skoda গাড়িটার দিকে তাকাচ্ছি না। কিন্তু পেছনের সিটে বসে থাকা দুটো চোখ আমাকে দেখছে। চিনতে পেরেছে নাকি? না না এ হতে পারেনা। এতদিন হয়ে গেল। তাছাড়া আমি হেলমেট খুলি নি। চিনবে কি করে? ভুল ভাবনা আমার। ও আর আমাকে দেখছে না হয়ত।

স্কুটিতে উঠে বসে স্টাট দিলাম। সাড়ে তিন মিনিট হয়ে গিয়েছে। সিগন্যাল এখনও লাল। কি জানি কপালে কি নাচছে। এগোতে চেষ্টা করলাম। এই গাড়িটার থেকে‌ আমায় দূরে পালাতে‌ হবে, হবেই।

সামনে বাস। তার পাশে আরও দুটি গাড়ি। এগোনোর কোন স্কোপ নেই। অগত্যা দাঁড়িয়ে র‌ইলাম। যেখানে ছিলাম‌। কিন্তু গাড়িটার দিকে তাকাব‌ না আমি, তাকাব‌ই না। হর্ন এর‌ আওয়াজ‌ কানে এল। বুঝলাম Skoda থেকে আসছে আওয়াজটা। এবং কিভাবে যেন বুঝলাম আমাকে উদ্দেশ্য করেই হর্ন বাজাচ্ছে চালক। কিন্তু আমি তো পাশে দাঁড়িয়ে। আবার হর্ন বাজল। তাকালাম। ছেলেটি জিজ্ঞেস করল " ঠিক আছেন তো? লাগেনি তো?"
মাথা হাত নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম, লাগেনি। পেছনে না তাকানোর ভান করেও নিজেকে আটকাতে পারলাম না। চোখটা গেল পিছনের সিটে। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। বরফ জমে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল আমার। চোখদুটো এখনও আমার দিকে তাকিয়ে একইভাবে। 
চোখটা ফিরিয়ে নিলাম। কিন্তু জানিনা কোন মন্ত্রবলে আমার চোখদুটো কেবল সেই গাড়ির পেছনের সিটে চলে যেতে লাগল। সেই চোখদুটো একভাবে আমার দিকে তাকিয়ে। 

আরও মিনিট দুই পর পোঁ পোঁ আওয়াজ পেয়ে বুঝলাম লাল সবুজ হয়েছে। এগোনোর রাস্তা পরিষ্কার। গাড়িটা এগিয়ে গেল। সেই দুই চোখ তখনও আমার দিকে তাকিয়ে।‌ হাত তুলে দেখাল আমায় তৃষা। তার‌ কোলে একটা শিশু। মনে পড়ল‌ বছর দেড়েক আগের সেই একলা রাত্রি। আমি আর সেই দুচোখের একটা গোপন সম্পর্ক। শরীরি খেলা শেষের সেই চেনা বিচ্ছেদ। আর তার সেই না বলা প্রতিবাদ। সেই শেষ দুচোখে ঘৃণার সেই আগুন। আর সবটা একা বহন করার এক প্রতিবাদী প্রতিশ্রুতি।